একসঙ্গে বেশি মানুষ উঠলেই দুলতে থাকে কাঠের পুলটি। অবকাঠামো নড়বড়ে হওয়ায় অতিরিক্ত চাপ বাড়লে যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই ভয়ে দুই পাড়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে শত শত মানুষকে। নতুন সেতু নির্মিত না হওয়ায় পাঁচ বছর ধরে এভাবেই চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা সদরের রায়েন্দা ও খোন্তাকাটা ইউনিয়নের বাসিন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনসংলগ্ন শরণখোলা উপজেলার প্রধান শহর রায়েন্দা বাজার। রায়েন্দা খালের ওপর থাকা পুরনো আরসিসি সেতুটি ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট সকালে ধসে পড়ে। এরপর জনসাধারণের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কিছুটা দূরে দুই ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে নির্মিত হয় একটি অস্থায়ী কাঠের পুল। সময়ের ব্যবধানে সেই পুলটিও এখন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্তমানে নড়বড়ে এই সেতু দিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে শিক্ষার্থীসহ হাজার হাজার মানুষ।
উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ধসে পড়া সেতুর স্থানে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘গ্রামীণ সহায়তা সেতু প্রকল্প’ এর আওতায় ৭৪ মিটার দীর্ঘ সেতুটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১১ কোটি টাকা। মাটি পরীক্ষা ও নকশা প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পটির কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। ফলে রায়েন্দা খালের এই সেতু নির্মাণকাজ আর এগোয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, কাঠের পুলটির অবকাঠামো নোনা বাতাসে ক্ষয় হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। মাঝপথে সেতুটিকে ধারণ করে রাখা নারকেল গাছগুলোও রোদ-বৃষ্টিতে পচে ভেঙে গেছে। কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এই পথ দিয়েই পারাপার হচ্ছে মানুষ।
খালের দক্ষিণ পাড়ে উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্র রায়েন্দা বাজারে দুই হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও রয়েছে সরকারি হাসপাতাল, থানা, পোস্ট অফিস, প্রধান সরকারি-বেসরকারি ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাঁচটি ব্যাংক।
অন্যদিকে উত্তর পাড়ে রয়েছে শরণখোলা সরকারি ডিগ্রি কলেজ, একটি ফাজিল মাদ্রাসা, তিনটি বরফকল, একটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রসহ দুই শতাধিক দোকানপাট। এই দুটি ইউনিয়নের যোগাযোগ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এখন এই নড়বড়ে কাঠের পুল।
স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, পুলের ওপর উঠলেই কাঁপতে থাকে। মানুষ বেশি দেখলে পারাপারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। বর্ষা মৌসুমে কাদা-পানিতে কাঠের পাটাতন পিচ্ছিল হয়ে পড়ে, যা পার হওয়া আরও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা দ্রুত এখানে একটি পাকা সেতু নির্মাণের দাবি জানায়।
রায়েন্দা বাজারের ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম, সরোয়ার হোসেন ও খোকন শিকদার অভিযোগ করে বলেন, কাঠের পুলটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ভারী মালামাল নিয়ে পুল পার হওয়া যায় না। আরও একবছর আগে শুনেছি এখানে পাকা ব্রিজ হবে। ব্রিজ হবে হবে করে পাঁচ বছর পার হতে চলেছে। কিন্তু তার কোনো আলামত দেখছি না আজও। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন ও নিরাপদ চলাচলের জন্য রায়েন্দা খালের ওপর জরুরিভাবে পাকা ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানাই সরকারের কাছে।
রায়েন্দা-রাজৈর ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আব্দুল জলিল আনোয়ারী ও রায়েন্দা সরকারি পাইলট হাই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল হালিম বলেন, কাঠের পুলের অবস্থা খুবই নাজুক। প্রতিদিন কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে এই পুল দিয়ে। এখানে পাকা সেতু নির্মাণ না হলে বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে যেকোনো সময়।
শরণখোলা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ভারপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন কিছু জটিলতার কারণে সেতু প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে বাতিল হয়ে যায় প্রকল্পটি। বিষয়টি তখন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবিহিত করা হয়েছিল। সম্প্রতি আবারও এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে বরাদ্দ না পাওয়া পর্যন্ত বিকল্প কিছুই করা সম্ভব নয়।
দেশবার্তা/আইএইচই/একে