বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেছেন, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
দৈনিক দেশবার্তার সঙ্গে একান্ত আলাপকালে তিনি বলেন, আমাদের এখন মূল বিষয় হলো; যে চেতনাকে ধারণ করে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান, আমাদের বিজয় সেই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে বাস্তবায়ন করা। বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। প্রত্যেকের কথা বলার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মানুষ যাতে মতপ্রকাশ করতে পারে, রাজনৈতিকভাবে যে কেউ যেনো সমালোচনা করতে পারে। তবে সমালোচনার জন্য কেউ যেন আক্রান্ত না হয়। সেই ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক জীবনের বিনিময়ে বিজয় হয়েছে। সেই আত্মদানকারী শহীদের যে স্প্রিট, তাদের সেই আত্মদানটা মহিমান্বিত হবে। তাদের উদ্দেশ্য পূরণ হবে।
রিজভী আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমরা ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে। জেলখানার ভেতর থেকে রাজপথে সরকার বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে সবকিছু শুনছি। সকাল ১০টা যখন তখন আমাদের ধরণা ছিল (৫ আগস্ট) আরো কিছু হবে। কিন্তু কোনো কিছু জানলাম না। তখনও লোকজনের কোন খবর পাচ্ছি না। আমরা একটু হতাশ হচ্ছি। তিনি বলেন, ৪ আগস্টে (২০২৪) যে পরিস্থিতি ছিল সেই প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিস্ট সরকার নামার কথা।
৫ আগস্ট হঠাৎ বেলা ১১টার দিকে শুনি রাস্তায় মানুষের ঢল নামছে। উত্তরা ও যাত্রাবাড়ি থেকে অসংখ্য মানুষ আসছে। আমরা খুবই আশান্বিত হলাম, উদ্দীপ্ত হলাম। হয়তো কিছু ঘটবে। দুপুর ১২টার দিকে আর্মির চীফ বক্তৃতা করবেন। এটা জানালো রেডিওতে। তখন আরো নিশ্চিত হলাম কিছু একটা হচ্ছে।
এরপর বেলা আড়াইটার দিকে আমরা ফাইনালি শুনলাম ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন। তখন জেলখানার মধ্যে হাজার হাজার বন্দিরা আনন্দ উল্লাস করছে। অনেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করল। তবে জেলখানা কর্তৃপক্ষ বললেন আপনারা যদি নিয়ন্ত্রণ না করেন, তাহলে বন্দিরা থাকবে না। এরমধ্যে ক’দিন আগে নরসিংদীর বন্দিরা জেলখানা ভেঙে পালিয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খরার চরম অবনতি আমরা হতে দেব না।
রিজভী বলেন, যে ওয়ার্ডের বিল্ডিংগুলোয় যেখানে বন্দিরা থাকে আমরা তখন সেখানে গিয়ে বক্তব্যে রেখে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করলাম। বাইরে থেকে জেল কর্তৃপক্ষ তালা দিল। এভাবে আমরা সময় কাটালাম রাত ১০টা পর্যন্ত।
তিনি বলেন, সূর্যমূখী নামে বন্দিদের রাখার জায়গা ছিল। ঠিক ডিভিশন ও শ্রেণীপ্রাপ্ত জায়গা না। মোটামুটি ভিআইপি বন্দি হলে এখানে রাখে। আমরা ওখানেই ছিলাম। তারপর রাত ১২টা পর্যন্ত সেদিন আমরা সবাই গল্প করলাম। খবর নিচ্ছি। আমাদেরকে জেল কর্তৃপক্ষ টেলিফোন দিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য। তারপর আমরা সবাই মিলে মোবাইল ও টেলিফোনে জেলখানার ভিতর থেকে নেতাকর্মীদের সাথে যতটুকু পারছি যোগাযোগের চেষ্টা করছি।
বিএনপির সিনিয়র এই নেতা বলেন, আমার শুধু এতটুকু মনে আছে বহুলোক ভিতরে ঢুকবে। জেলখানা ভেঙে ফেলবে। তখন উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্য বক্তৃতা করলাম। বক্তৃতা করার পর লোকজন সব সরে গেল। এসব করে জেলখানার ভেতর থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি। পরদিন (৬ আগস্ট) জেলখানা থেকে ছাড়া পেলাম। ছাড়া পেয়ে সরাসরি পার্টি অফিসে আসলাম। স্কাইপে দলের চেয়ারম্যানের (তখন ভারপ্রাপ্ত) সঙ্গে দেখা করলাম। আমাদের এখানে (নয়াপল্টন) একটা স্টেজ ছিল।
নেতৃবৃন্দ এসে সবাইকে শান্ত থাকার জন্য বললেন। কেউ যেন উচ্ছৃঙ্খল আচরণ না করে। সবাই বলাবলি করতে ছিল। পরের দিন সমাবেশ। আমরা এসেই সবাইকে সংগঠিত করা শুরু করলাম। সবাই বলাবলি করলাম যাতে লোকজন হয়। এখানে ম্যাডামের বক্তব্য পাঠ করা হলো। বক্তব্যে রাখলেন দলের চেয়ারম্যানও।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মুখ থেকে স্বাভাবিক অবস্থা জানার জন্য। ছাত্ররা রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করেছে। বিভিন্ন জায়গায় আমরা যেভাবে পেরেছি খাবার দিয়েছি।
তিনি বলেন, ৩-৪ দিন বাংলাদেশের সরকার ছিল না। দেশটা শান্তিপূর্ণভাবে চলেছে। কোন চুরি, ডাকাতি ছিল না। এটাতো একটা বিরল ঘটনা। পৃথিবীর সবদেশে একটা বিপ্লবের পর যে নৈরাজ্য ও বিভীষিকা হয়, সেই বিভীষিকা হতে দেয়নি। আমি বলব সেখানে পলিটিক্যাল পার্টিগুলো যারা গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছিল তারা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে।
যারা সব চেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন তারাও দায়িত্বশীলতার প্রমাণ দিয়েছেন। ট্রাফিক থেকে শুরু করে পাড়া মহল্লায় পাহারা দিয়েছেন। যার কারণে দুষ্কৃতকারীরা আশ্রয় পায়নি, কোন সুযোগ নিতে পারেনি বরং ওই তিনটা দিন প্রতিটা মহল্লা অত্যন্ত নিরাপদ ছিল। কোন ধরনের অরাজকতার সৃষ্টি হয়নি। এরপর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হলো।
ছাত্রদের আন্দোলন প্রসঙ্গে রিজভী আহমেদ বলেন, যেদিন থেকে তারা কোটা বিরোধী আন্দোলন শুরু করলো। ওইদিন থেকে চেয়ারম্যানের পক্ষে থেকে আমরা দলের অবস্থান জানাই। আমরা তাদের সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করি। তিনি বলেন, ১৯ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিএনপির কর্মসূচি ছিল। কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। কারণ আগের দিন সমস্ত নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনলাইন, হোয়াটসঅ্যাপ এমনকি নরমাল টেলিফোনেও কথা বলতে পারছিলাম না। ঢাকা মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। কোনভাবে আমরা মজনু আর আমিনুলের নম্বর জোগাড় করি।
কারণ ওরাই লোকজন নিয়ে আসার মূল সেনাপতি থাকবে। রুহুল কবির বলেন, মজনু আর আমিনুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে দুপুর ১২টার মধ্যে প্রেসক্লাবের মধ্যে ঢুকে পড়ি। এরপর শুরু হলো প্রচন্ড তান্ডব। সাউন্ড গ্রেনেড, শর্টগানের আওয়াজ, খুবই ভয়ঙ্কর দৃশ্য। সাউন্ড গ্রেনেড মারছে অবিরাম ভাবে। সম্ভবত নুরুদের একটা প্রোগ্রাম ছিল পল্টনের মোড়ে। ওটা ভেঙে দেওয়া হয়। এরপরই ৫০-৬০ পুলিশ এসে আমাকে সরাসরি প্রেসক্লাবের ভেতর থেকে গ্রেফতার করলো। এটা বিরল ঘটনা। কারণ প্রেসক্লাবের ভেতর থেকে পুলিশ এসে কাউকে সরাসরি গ্রেফতার করতে পারে না।
রিজভী আহমেদ বলেন, কারাগারের মধ্যে বসে আমরা শুনছি প্রতিদিনের কর্মসূচি। তারপর ২ আগস্টে এক দফার আন্দোলনে চলে গেল। তখন মনে হল এবার আন্দোলনের বিজয় নিশ্চিত। কোটা বিরোধী আন্দোলন টার্নিং টু এ ওয়ান পয়েন্ট মুভমেন্ট। বুঝলাম এটা হবে-ইনশাআল্লাহ। ১৬ বছরের এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির অবসান হল।
দেশবার্তা/আইএ/এসবি/একে