ফেনী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জাল দলিল, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে নিবন্ধনসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে দলিল লেখক মো. শহীদ উল্লাহ খোকন ও তার ছেলে শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়।
ফেনী জেলা রেজিস্ট্রার আবদুর রহমান মুহাম্মদ তামিম সম্প্রতি এ তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও শোকজপত্রের সূত্রে জানা যায়, ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নের চর মধুয়াই গ্রামের বাসিন্দা শহীদ উল্লাহ খোকন ও তার ছেলে শাহাদাত হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ফেনী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ভূমি-সংক্রান্ত সেবা দিয়ে আসছেন। গত ২০ জুলাই সেবাগ্রহীতা জাহিদুল আলম জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, একটি দলিল নিবন্ধনের জন্য গত বছরের ৫ আগস্ট তিনি দলিল লেখক খোকনের কাছে যান। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখার পর খোকন ও তার ছেলে সরকারি পে-অর্ডারের বাইরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা দাবি করেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি অন্য এক দলিল লেখকের কাছে তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত হন যে, তার কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রায় দেড় লাখ টাকা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে তিনি অন্য দলিল লেখকের মাধ্যমে জমি নিবন্ধন করেন।
এ ছাড়া মোহাম্মদ হায়দার আলী শাহরিয়ার নামে আরেক ভুক্তভোগী জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ দিয়ে খোকন ও শাহাদাতের বিরুদ্ধে দলিল জালিয়াতি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ তোলেন। অভিযোগে তিনি কয়েকটি দলিল নম্বর উল্লেখ করে বিষয়গুলোর তদন্ত এবং অভিযুক্ত পিতা-পুত্রের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানান।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় জানায়, একাধিক সেবাগ্রহীতার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পরশুরাম সাব-রেজিস্ট্রার প্রবাল কৃষ্ণ সাহাকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ৬ আগস্ট গঠিত এ কমিটিকে এক মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্তের আদেশে বলা হয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের ভিত্তিতে ফেনী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ২০১৮ সালের দলিল নম্বর ৫৪৮৯, ৫১৭৬, ৬৩৫১ ও ৬৯৪৮; ২০১৯ সালের ১০২, ২৮৩, ৩৬০, ১২৩১, ৩১৬২ ও ৩১৬৭; ২০২০ সালের ৩৬৭৬, ৫৫৪২ ও ৬১২৩; এবং ২০২১ সালের ৭৩৬, ৭৫৮, ৯৩৭, ১১৬৬, ১৬৭৬, ২২৬৫, ২৩৯৬, ২৬০৬, ২৮৫৮, ৩২৪৪, ৩৭৪১, ৩৯১২ ও ৪০৯৫ নম্বর দলিলসহ মোট ২৬টি দলিলের সহিমুহুরী নকল, খাজনা দাখিলা এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের এসএ ও বিএস পর্চা পর্যালোচনা করে দলিলে উল্লেখিত জমির শ্রেণি অনুযায়ী সরকারি রাজস্ব আদায় হয়েছে কি না, তা তদন্ত করতে বলা হয়েছে। আগামী ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে শাহাদাত হোসেন বলেন, "আমাদের বিরুদ্ধে কে, কখন, কী অভিযোগ দিয়েছে, কিছুই জানি না। অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা আমার কাছে কিছু জানতে চাননি। দলিল লেখক সমিতির নিয়ম মেনেই সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে আমরা ফি আদায় করে থাকি। এখানে বাড়তি টাকা আদায়ের কোনো সুযোগ নেই।"
অভিযোগ অস্বীকার করে মো. শহীদ উল্লাহ খোকন বলেন, "সম্প্রতি রেজিস্ট্রার স্যারের সঙ্গে আমার রাগারাগি হয়েছে। এ কারণে তিনি এসব করছেন। আমি ৩৬ বছর ধরে দলিল লিখছি, এর আগে কেউ এমন অভিযোগ করেনি।"
ফেনী জেলা রেজিস্ট্রার আবদুর রহমান মুহাম্মদ তামিম বলেন, "দুইজন সেবাগ্রহীতার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দলিল লেখক মো. শহীদ উল্লাহ খোকন ও তার সহযোগী ছেলে শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
প্রতিনিধি/আরএইচ