ভারত ও চীনের সম্পর্ককে আরও স্থিতিশীল ও কার্যকর পর্যায়ে নিতে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও আলোচনা করেছেন তারা।
দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই নেতা ভারত-চীন সম্পর্কের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। প্রায় সাত বছর পর চীনের প্রেসিডেন্টের ভারত সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকে মোদী বলেন, সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ভারত-চীন সম্পর্কের ধারাবাহিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সীমান্তে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ রাখা গেলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্রেও অগ্রগতি আরও সহজ হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সীমান্তসংক্রান্ত বিদ্যমান চুক্তি ও সমঝোতাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নে দুই দেশকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সীমান্ত বিরোধের একটি ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও উভয় দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন দুই নেতা।
মতপার্থক্যকে যেন কোনোভাবেই বড় ধরনের বিরোধে রূপ নিতে দেওয়া না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান, সংবেদনশীলতা ও স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন মোদী।
বৈঠকে দুই নেতা দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ২০২৫ সালের আগস্টে তিয়ানজিনে তাদের সর্বশেষ বৈঠকের পর ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেসব অগ্রগতি হয়েছে, সেগুলো নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা।
বৈঠক শেষে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে দুই নেতা একমত হয়েছেন। পারস্পরিক সম্মান, স্বার্থ ও সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
অন্যদিকে বৈঠকে শি জিনপিং ভারত-চীন সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, দুই দেশের জাতীয় পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও পরস্পরের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা, সহযোগিতা বাড়ানো এবং অভিন্ন উন্নয়নের জন্য একসঙ্গে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
শি আরও বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের এই সময়ে বিশ্বের দুই জনবহুল দেশ ভারত ও চীনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। নিজেদের জনগণের কল্যাণ এবং মানবতার ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে দুই দেশকে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করতে হবে।
বিশ্বশান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে ভারত ও চীনকে আরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে আরও সমতাভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় দুই দেশের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন চীনা প্রেসিডেন্ট।
বৈঠকে শি জানান, গত ১৫ জুন তার জন্মদিনে ভারত সফরের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন তিনি। মোদীর সঙ্গে এ পর্যন্ত তার ২১ বার বৈঠক হয়েছে উল্লেখ করে শি বলেন, এসব যোগাযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে স্থিতিশীল উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে সহায়ক হয়েছে।
সীমান্ত বিরোধ দীর্ঘদিন ধরেই ভারত-চীন সম্পর্কের অন্যতম বড় অমীমাংসিত ইস্যু। ভারত বরাবরই বলে আসছে, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় না থাকলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে নেওয়া কঠিন। অন্যদিকে চীনের অবস্থান হলো, সীমান্ত বিরোধকে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যান্য বিষয় থেকে আলাদা রেখে মোকাবিলা করা উচিত।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিক যোগাযোগে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে। দিল্লির বৈঠকেও সীমান্ত ইস্যুর পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় মোদী জানান, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ভারত-চীন সম্পর্কের পুরো পরিসর নিয়ে তার বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী বছর ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ায় চীনকে শুভেচ্ছা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত শান্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়ার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে ভারত-চীন সম্পর্কের নতুন গতিপথ তৈরিতে কতটা ভূমিকা রাখে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
দেশবার্তা/এমআর