জানাই ছিল, জাকার্তার এই যুদ্ধক্ষেত্রে ফেভারিট হিসেবেই নামবে স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়া। এটাও তো অজানা ছিল না যে, ওদের দলে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের আমদানি ঘটিয়ে খেলায় একটা তীব্র ও নিষ্ঠুর ইউরোপিয়ান ঝাঁজ আনা হবে। তাই বলে প্রতি ১০ মিনিট অন্তর লাল-সবুজের জালে একটা করে গোল ঢুকে যাবে? গোল উৎসবের এমন আদিম উল্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে ৯-২ গোলে এভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে হবে হামজাদের?
জাকার্তার স্টেডিয়ামে গতকাল বৃহস্পতিবারের রাতের ওই ৯০ মিনিট যেন কোনো ফুটবল ম্যাচ ছিল না; ওটা ছিল আসলে একটা রক্তারক্তি লাইভ হরর শো! সেখানে ডিফেন্ডার তারিক কিংবা সাদের ম্যান মার্কিংয়ের ভুলগুলো নিয়ে কাটাছেঁড়া হতে পারে কিংবা একা গোলপোস্ট আগলাতে গিয়ে গোলরক্ষক শ্রাবণের চরম অসহায়ত্ব নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা যেতে পারে; কিন্তু ম্যাচের শেষ বাঁশি যখন বাজল, তখন বোর্ডে লেখা ওই ৯ গোলের কলঙ্কিত লজ্জা তো সত্যি! ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের আলো-হাওয়া গায়ে মেখে আসা খোদ হামজা চৌধুরীইবা এই ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ ঢাকবেন কী করে?
ম্যাচের পর প্রতিপক্ষের ফাউল আর মাঠের ভেতরের সস্তা দুর্ব্যবহার নিয়ে হামজা নিজের তীব্র অসন্তুষ্টি আর ক্ষোভ উগরে দিচ্ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওতে করে কি আর বাংলাদেশ ফুটবলের কপালে লেপ্টে যাওয়া এই নিকষ কালো অধ্যায়টি মুছে ফেলা যাবে? ৪৪ বছর পর আবার ৯ গোল হজম করার এই চরম অভিশপ্ত রাতটি দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর বুক থেকে সহজে উধাও হওয়ার নয়। ইতিহাস ঘেঁটে পরিসংখ্যানবিদরা হয়তো মনে করিয়ে দেবেন, গত শতকের আশি-নব্বই দশকে এর আগে মাত্র দুবার এমন ৯ গোলের ট্র্যাজেডি দেখেছিল বাংলাদেশ। ১৯৭৯ সালে ইনচনে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে সেই ৯-০ আর ১৯৮২ সালে করাচির মাঠে ইরানের বিপক্ষে ৯-১ গোলের সেই চাবুকের দাগ। কিন্তু জাকার্তার এই রাত তো আগের সব ক্ষত এক নিমেষে জ্যান্ত করে দিয়ে গেল!
ইন্দোনেশিয়া কেন এত খুনে মানসিকতায় ধরা দিল বাংলাদেশের সামনে? ফিফার একটা অলিখিত নির্দেশনা থাকে প্রতিটি দলের কাছে। প্রতিপক্ষ দুর্বল হলে ছয় গোলের বেশি যেন না দেওয়া হয়! ইন্দোনেশিয়া তো প্রথমার্ধেই ৬ গোল দিয়ে বসে বাংলাদেশকে। তার পরও কেন ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে গোল দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে তারা? কেন ইন্দোনেশিয়ার গোলরক্ষকও কর্নার কিকের সময় বাংলাদেশের জালের সামনে এসে দাঁড়ান? আসলে এখানেই সমীকরণ মেলানোর জটিল অঙ্ক তাড়া করছিল ইন্দোনেশিয়াকে। গ্রুপের সেরা হয়ে ফাইনালে যাওয়ার জন্য তাদের মালয়েশিয়ার চেয়ে বেশি গোল ব্যবধানে পয়েন্টের শীর্ষে থাকতে হতো। সেখানে একই সময়ে অন্য মাঠে মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরকে ৬-০ গোলের ব্যবধানে এগিয়ে থাকে। বাংলাদেশ যখন ৭-২ গোলে পিছিয়ে, তখনও ফাইনাল নিশ্চিত ছিল না ইন্দোনেশিয়ার। তাদের দরকার ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে ৭ গোলের ব্যবধানে জয়। তাই তখন বারবার মেজাজ হারাতে থাকেন রমনিরা। শেষ পর্যন্ত জামালদের জালে ৯ গোল দেওয়ার পরই বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে ইন্দোনেশিয়া দল।
তাদের তারকা স্ট্রাইকার বেকার একাই করেন পাঁচ-পাঁচটি গোল; ম্যাচের ১১, ২০, ৩৭, ৪২ আর অন্তিম ৯৮ মিনিটে শ্রাবণের সামনে অঝোড়ে গোলবৃষ্টি নামান তিনি। তাঁর মতো ইন্দোনেশিয়া দলের বেশির ভাগ ফুটবলারই ছিলেন শারীরিকভাবে দীর্ঘাদেহী। তাদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান ট্যাকলে শুকি-তারিক-সোহেলদের কেউ পেরে ওঠেননি। স্বাগতিকরা ম্যাচের শুরু থেকেই প্রেসিং ফুটবল খেলে বাংলাদেশের গোলপোস্টের সামনে সবাই মিলে ভিড় জমাতে সফল হয়েছে। সেখানে তাদের ফাঁকা ডিফেন্সের সুযোগ নিয়ে শাহরিয়ার ইমন আর বদলি নামানো ফারহান দুটি গোল করতে পারেন। হয়তো আরও একটি গোল হতে পারত, যদি ফারহান ম্যাচের শেষ দিকে নিজে কিক না নিয়ে পাসটি বাড়িয়ে দিতেন হামজার কাছে। তবে ইন্দোনেশিয়ার এমন ঝড়ের রাতে সবকিছু বোধ হয় ব্যাকরণ মেনে হয় না। তাই শেষ সাত মিনিটে গিয়েও দুটি গোল হজম করতে হয়। নিজের ২৯তম জন্মদিনে এমন কাঁটা ভরা উপহার নিশ্চয় চাননি হামজা।
দেশবার্তা/এমআর