শহর থেকে মফস্বল, এমনকি গ্রামেও বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে খাবার পরিবেশনে বেড়েছে ওয়ান টাইম প্লেটের ব্যবহার। দাম তুলনামূলক কম এবং ব্যবহারের পর ধোয়া বা পরিষ্কারের ঝামেলা না থাকায় বিয়ে, সুন্নাতে খাতনা, মৃত্যুবার্ষিকী, মিলাদ-মাহফিল, পিকনিকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসব প্লেট ব্যবহার করা হচ্ছে। হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও খাবার পরিবেশনে ব্যবহৃত হচ্ছে প্লাস্টিকের তৈরি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লেট।
তবে এসব প্লেটের ব্যবহার মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে প্লাস্টিকের তৈরি প্লেটে গরম খাবার রাখলে রাসায়নিক উপাদান খাবারের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ব্যবহারের পর এসব প্লেট যত্রতত্র ফেলে দেওয়ায় মাটি ও পানিদূষণও বাড়ছে।
প্লাস্টিকের তৈরি অনেক ওয়ান টাইম প্লেটে পলিস্টাইরিনসহ বিভিন্ন ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হয়। গরম খাবার বা পানীয় রাখলে এসব উপাদান থেকে রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে এসব রাসায়নিক মানবদেহের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অভিমত।
প্লাস্টিকের কণার প্রভাবে হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হরমোনজনিত সমস্যা তৈরি হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান। শিশুদের বিকাশ এবং গর্ভের শিশুর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সন্তান ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ার ক্ষেত্রেও প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণার ভূমিকা থাকতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের প্লেট সহজে মাটিতে মিশে যায় না। দীর্ঘ সময় পরিবেশে থেকে এগুলো মাটি ও পানিদূষণ করতে পারে। এসব প্লেট ব্যবহারের পর পুকুর, ডোবা, ড্রেন কিংবা রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়ায় স্থানীয় পরিবেশেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এতে কৃষিজমির মাটির গুণাগুণ ও কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরেজমিনে পাবনার কাশিনাথপুর বাজার ঘুরে দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিন দিন ওয়ান টাইম প্লেটের চাহিদা বাড়ছে। বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে খাবার পরিবেশনে এসব প্লেট ব্যবহার করা হচ্ছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ঝামেলা না থাকায় এবং দাম কম হওয়ায় ধনী-গরিব নির্বিশেষে মানুষ এর ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছেন।
বাজারে আকারভেদে ১০০টি বড় প্লেট ২৪০ টাকা, মাঝারি আকারের ১০০টি ১৬০ টাকা এবং ছোট আকারের ১০০টি প্লেট ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ফুলকুঁড়ি মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক আনিছুর রহমান (আনিছ) বলেন, গ্রামেও এখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্লাস্টিকের ওয়ান টাইম প্লেটে খাবার পরিবেশন করা হয়। এটি ব্যবহার সহজ এবং পরিষ্কারের ঝামেলা নেই। তবে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও মানুষ অবাধে এসব প্লেট ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিসহ (বেলা) ১১টি সংগঠনের করা রিট আবেদনের সূত্রে জানা যায়, প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এক বছরের মধ্যে দেশের সব হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ওয়ান টাইম প্লেট, পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যাগের বহন, বিক্রয়, ব্যবহার ও বিপণন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছিল। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো এসব পণ্যের ব্যবহার ও ক্রয়-বিক্রয় চলছে।
ওয়ান টাইম প্লেটের বিকল্প হিসেবে কাগজের তৈরি প্লেট বা পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারের কথা ভাবছেন পরিবেশবিদরা।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিদ মো. মাহবুবুর রহমান, এমপিএইচ (মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ) বলেন, ওয়ান টাইম প্লাস্টিক প্লেটে বিসফেনল, স্টাইরিন ও থ্যালেটসসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে। এসব প্লেটে খাবার খেলে রাসায়নিক উপাদান শরীরে প্রবেশের আশঙ্কা থাকে। এর ফলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, হজমের সমস্যা, ডায়রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পেটে জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। নিয়মিত ব্যবহারে ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তিনি খাবার পরিবেশনে সিরামিকের প্লেট ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে বলেন, “মনে রাখবেন, আরামের চেয়েও শরীরের সুস্থতা বড়। শরীর সুস্থ থাকলেই জীবন উপভোগ করতে পারবেন।”
প্রতিনিধি/আরএইচ