একটি অসুখী বা তিক্ত সম্পর্ক শুধু মানসিক চাপই বাড়ায় না, আক্ষরিক অর্থেই তা শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কে অসন্তোষ বুকে ব্যথা, অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়-যা ধূমপান বা কায়িক পরিশ্রম না করার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির সমতুল্য। অন্যদিকে, একটি সুষম ও আনন্দময় সম্পর্ক মানুষের জীবনকাল ও সুস্থতা বৃদ্ধি করে।
কিন্তু একটি টালমাটাল ও জটিল হয়ে পড়া সম্পর্ককে কীভাবে পুনরায় সুন্দর ও সুখী করে তোলা সম্ভব? বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং অভিজ্ঞ কাপল থেরাপিস্টদের সুপারিশের আলোকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উপায়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো-
বারবার একই বিষয়ে দ্বন্দ্ব ও অচলাবস্থা (গ্রিড লক)
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৬৯ শতাংশ ক্ষেত্রে দম্পতিরা তাঁদের পুরো সম্পর্কের সময়ে মূলত নির্দিষ্ট কয়েকটি মূল বিষয় নিয়েই বারবার ঝগড়ায় জড়ান। অর্থনীতি, সন্তান লালন-পালন, যৌনজীবন, পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা গৃহস্থালি কাজের মতো মৌলিক ইস্যুগুলো এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে থাকে।
তবে গবেষকেরা মনে করেন, সম্পর্কে মতবিরোধ থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক। সুখী ও অসুখী-সব ধরনের দম্পতিই তর্ক করেন। মূল পার্থক্য তৈরি হয় ঝগড়ার সময় একে অপরের প্রতি আচরণের ধরনের ওপর।
সম্পর্কের ক্ষতিকারক চার আচরণ
আমেরিকার গটম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষকদের মতে, চারটি নির্দিষ্ট কটু আচরণ যেকোনো সম্পর্কের ভিত দ্রুত ধ্বংস করে দেয়- সমালোচনা: সঙ্গীর ব্যক্তিত্বের ওপর সরাসরি আক্রমণ; অবজ্ঞা: তুচ্ছতাচ্ছিল্য, ব্যঙ্গ বা অসম্মানজনক কথা বলা; আত্মপক্ষ সমর্থন: নিজের ভুল না মেনে কেবল আত্মরক্ষার অজুহাত তৈরি করা; নীরবতা (স্টোনওয়ালিং): কথা বলা বন্ধ করে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা।
এই বিষাক্ত উপাদানগুলো সম্পর্কের আয়ু কমিয়ে দেয়। তবে উভয় পক্ষ সচেষ্ট হলে এবং পরস্পরকে বোঝার মানসিকতা রাখলে এসব অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব।
যোগাযোগ ও সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি
সহানভূতি ও সংবেদনশীলতা সুন্দর সম্পর্কের চাবিকাঠি। আপনার সঙ্গী যে আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, বুঝতে পারেন এবং সমর্থন জানান-এই অনুভূতিই সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি করে। গবেষণায় দেখা গেছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ঘরের কাজে অংশীদারিত্ব বজায় রাখলে পারিবারিক অসন্তোষ অনেকটাই কমে যায়। ঝগড়া যদি সমাধানমুখী ও সম্মানজনক হয়, তবে তা সম্পর্কের বোঝাপড়া আরও মজবুত করে এবং ঘুমের সার্বিক উন্নতি ঘটায়।
পরস্পরের অতীত ও স্বপ্ন বোঝার চেষ্টা
বহু পুরোনো অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের পথ খোলে যখন দম্পতিরা একে অপরের পেছনের অভিজ্ঞতা ও স্বপ্নগুলোকে অনুধাবন করার চেষ্টা করেন। যেমন-টাকা খরচের অভ্যাসের পেছনে ছোটবেলার দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা প্রভাব ফেলতে পারে। থেরাপিস্টদের মতে, যখন একজন সঙ্গী বুঝতে পারেন কেন অন্যজন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে সংবেদনশীল, তখন আপস করা ও যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অনেক সহজ হয়ে যায়।
কাপল থেরাপির ভূমিকা
যদি সম্পর্কে তিক্ততা চরম আকার ধারণ করে, তবে পেশাদার ‘কাপল থেরাপি’র সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, থেরাপি নেওয়া দম্পতিদের প্রায় ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে সম্পর্কের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে।
তবে থেরাপিস্টদের মূল বক্তব্য হলো-বিশ্বের সেরা থেরাপির সাহায্য নিলেও সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর করার মূল ইচ্ছাটি আসতে হবে দুজনের ভেতর থেকেই। নিজেদের মধ্যে শোনা, বোঝা ও সহানুভূতি বজায় রাখার চর্চা কেবল সংকট কাটায় না, যেকোনো ভালো সম্পর্ককে আরও চমৎকার করে তোলে। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
দেশবার্তা/একে