বিশ্ব বসতি দিবস আমাদের সামনে প্রতি বছরই একটি মৌলিক প্রশ্ন হাজির করে-মানুষ কি কেবল মাথা গোঁজার একটি জায়গা চায়, নাকি চায় নিরাপদ, সাশ্রয়ী, স্বাস্থ্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন? বাস্তবতা বলছে, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মতো বাংলাদেশের মানুষের কাছেও নিরাপদ আবাসন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘের হিসাবে বিশ্বে প্রায় ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মানুষ আবাসনসংকটে রয়েছে। আবাসন তাই নিছক ইট-কাঠের স্থাপনা নয়; এটি মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। UN-Habitat-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের নগর জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ এবং বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা দ্বিগুণ হতে পারে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে শহরাঞ্চলে আবাসন ঘাটতি ৮৫ লাখ ইউনিটে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ আমরা একদিকে শহর সম্প্রসারণ করছি, অন্যদিকে মানুষের সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আবাসন তৈরি করতে পারছি না।
ঢাকার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। রাজধানীতে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধার কেন্দ্রীভবনের কারণে প্রতিদিনই মানুষের চাপ বাড়ছে। জমির অস্বাভাবিক মূল্য, বাড়িভাড়া, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং নিম্নআয়ের মানুষের সীমিত আয়ের কারণে নগরের প্রান্তে ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বর্ষা এলেই এই সংকটের আরেকটি চেহারা সামনে আসে। ২০২৬ সালের বর্ষায় সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাশয় সংকোচন, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ও রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা এ সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।
চট্টগ্রামের অবস্থাও কম উদ্বেগজনক নয়। গত তিন দশকে নগরটিতে প্রায় ২১ হাজার পুকুর ও অন্যান্য জলাধার হারিয়ে গেছে বলে সাম্প্রতিক এক আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। জলাধার ও নিচু জমি ভরাট, প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরিকল্পনার দুর্বল বাস্তবায়নের ফলে জলাবদ্ধতা সেখানে প্রায় স্থায়ী নগর-সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে-একটি শহর যদি তার প্রাকৃতিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের জায়গাগুলোই হারিয়ে ফেলে, তবে কেবল নতুন ভবন নির্মাণ করে তাকে কি আধুনিক শহর বলা যায়?
রংপুরের বাস্তবতাও আমাদের ভিন্ন শিক্ষা দেয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী রংপুর জেলায় ২৪ হাজার ৪২৫টি বস্তি পরিবারের প্রায় ৯২ হাজার ৪৭০ জন মানুষ ছিল। দিনাজপুর জেলায়ও ৮ হাজার ৫৪৩টি বস্তি পরিবারের ৩২ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করছিলেন। অর্থাৎ আবাসন সমস্যা শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রামের সমস্যা নয়; দেশের আঞ্চলিক শহরগুলোতেও এর বিস্তার ঘটছে।
এ অবস্থায় শুধু বস্তি উচ্ছেদকে সমাধান হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। উচ্ছেদ করে মানুষকে অন্যত্র ঠেলে দিলে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং নতুন বস্তি তৈরি হয়। প্রয়োজন যেখানে সম্ভব সেখানে বস্তি উন্নয়ন, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং পুনর্বাসনের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা করা।
সবচেয়ে জরুরি হলো আবাসনকে বাজারনির্ভর পণ্য হিসেবে না দেখে সামাজিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যের আবাসন, দীর্ঘমেয়াদি সহজ ঋণ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং পরিকল্পিত ভাড়াভিত্তিক আবাসন প্রকল্প বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শহরের বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা বাড়াতে হবে, যাতে জীবিকার জন্য মানুষকে রাজধানীমুখী হতে না হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনও আবাসন নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে। ২০২৬ সালের বন্যা ও ভূমিধসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১১ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বহু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের আবাসন হতে হবে দুর্যোগসহনশীল ও জলবায়ু-অভিযোজিত।
বিশ্ব বসতি দিবসের শিক্ষা তাই অত্যন্ত পরিষ্কার—শুধু শহর বড় করলেই উন্নয়ন হয় না; মানুষের বসবাসযোগ্য জীবন নিশ্চিত করাই উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড। উন্নয়নের নামে জলাশয় ভরাট, কৃষিজমি নষ্ট, খাল দখল কিংবা নিম্নআয়ের মানুষকে উচ্ছেদ করে কোনো টেকসই নগর গড়ে উঠতে পারে না।
তাই এখনই সমন্বিত জাতীয় আবাসননীতি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।পরিকল্পিত নগরায়ণ, সাশ্রয়ী আবাসন, জলাধার সংরক্ষণ, সবুজ এলাকা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
বিশ্ব বসতি দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক-শুধু বসতি নয়, আমরা গড়ে তুলব বাসযোগ্য বাংলাদেশ; যেখানে একজন দরিদ্র মানুষও নিরাপদ আশ্রয়ের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না।
লেখক: গণমাধ্যম ও সমাজকর্মী (মতামত লেখকের নিজস্ব )