বাজারে বহুল প্রচলিত বিড়ালের খাবারে (ক্যাট ফুড) সিসা, পারদ, আর্সেনিক ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতু, আগাছানাশক এবং প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা পণ্য পরীক্ষাকারী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ক্লিন লেবেল প্রজেক্ট’ এর এক গবেষণায় এসব তথ্য সামনে এসেছে।
সিএনএন’র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শীর্ষস্থানীয় ১০০টি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ১২২টির বেশি নমুনার ওপর পরীক্ষা চালিয়ে এই বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। ড্রাই ফুড, ওয়েট ফুড কিংবা ফ্রিজ-ড্রাইড-সব ধরনের ক্যাট ফুডেই এসব ক্ষতিকর উপাদান মিলেছে। এমনকি ‘প্রাকৃতিক’ বা ‘উচ্চ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন’ হিসেবে বাজারজাত করা পণ্যগুলোও এই বিষাক্ততার বাইরে নয়।
গবেষণাটিতে দেখা যায়, পরীক্ষার ৯৯ শতাংশ নমুনায় মিলছে সিসা, ৯৬ শতাংশে ক্যাডমিয়াম এবং ৯৪ শতাংশ খাবারে আর্সেনিক রয়েছে। এতে আরও দেখা গেছে, ড্রাই ক্যাট ফুডে সিসার পরিমাণ ওয়েট খাবারের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ও প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক মলি হ্যামিল্টন জানান, বিড়াল প্রতিদিন একই খাবার গ্রহণ করায় তাদের শরীরে এসব বিষ ধীরে ধীরে জমতে থাকে। এটি বিড়ালের কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। ক্যাডমিয়াম ক্যানসার সৃষ্টি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করে এবং সিসা শরীরের সার্বিক কার্যক্ষমতা নষ্ট করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সামুদ্রিক মাছভিত্তিক ক্যাট ফুডে পারদ ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। সামুদ্রিক মাছের খাবারে অন্য প্রোটিনের তুলনায় পারদের মাত্রা প্রায় ১৮ গুণ এবং ক্যাডমিয়াম ২ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। মাছভিত্তিক ওয়েট ফুডে সাধারণ মুরগির মাংসের চেয়ে পারদের পরিমাণ প্রায় ২৮ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে মুরগির মাংসভিত্তিক খাবারে পারদ ও ক্যাডমিয়াম কম থাকলেও সিসা ও আগাছানাশকের পরিমাণ বেশি। পরিচ্ছন্নতার মানদণ্ডে মুরগির মাংসভিত্তিক ৮৫ শতাংশ খাবার উত্তীর্ণ হলেও সামুদ্রিক মাছভিত্তিক খাবারে তা ছিল মাত্র ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
অরগানিক বা জৈব পদ্ধতিতে চাষ না করা শাকসবজি ও উদ্ভিজ্জ উপাদান যুক্ত করায় খাবারে কৃষিতে ব্যবহৃত আগাছানাশক 'গ্লাইফোসেট' ঢুকছে, যা ৩৭ শতাংশ ক্যাট ফুডে পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ক্যানসার বিষয়ক গবেষণা সংস্থা গ্লাইফোসেটকে ক্যানসার সৃষ্টিকারী সম্ভাব্য উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এছাড়া অর্ধেকেরও বেশি ক্যাট ফুডে ‘ডিইএইচপি’ নামক এক ধরনের প্লাস্টিক কেমিক্যালের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা ক্যানসার ও জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ায়। কৌটা ও পাউচজাত ক্যাট ফুডে এর মাত্রা সর্বাধিক।
যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা নিরাপত্তা সংস্থা ‘টক্সিক ফ্রি ফিউচার’ এর বিজ্ঞান বিষয়ক পরিচালক রায়েন বাবাদি এটিকে একটি সুপরিচালিত গবেষণা হিসেবে উল্লেখ করে ক্ষতিকর রাসায়নিক দূর করতে খুচরা বিক্রেতাদের বাধ্য করার জোর দাবি জানান।
যদিও ক্যাট ফুড প্রস্তুতকারকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ‘পেট ফুড ইনস্টিটিউট’ এর সিইও এলিস ফেনিগ জানান, প্রস্তুতকারকেরা কঠোর খাদ্য নিরাপত্তা ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করেন এবং তাঁদের পণ্য নিরাপদ। তবে ক্লিন লেবেল প্রজেক্ট নিশ্চিত করেছে, কোনো ব্র্যান্ড যেন ফলে প্রভাব ফেলতে না পারে সেজন্য প্রতিটি পণ্য বাজার থেকে সরাসরি কেনা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বিড়ালের খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন- খাবারে বৈচিত্র্য আনা (কেবল মাছ না দিয়ে মাঝে মাঝে মুরগি বা অন্য প্রোটিন দেওয়া); লেবেল সতর্কতার সঙ্গে পড়া; পণ্যের কেবল প্রথম উপাদানের ওপর সম্পূর্ণ ভরসা না রাখা; নিয়মিত রাসায়নিক ও নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানো হয় কি না, তা জানতে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা।
দেশবার্তা/একে