‘বিক্রি করা কিডনি আবার গজাবে’, দালালদের এমন অবিশ্বাস্য প্রতারণা ও প্রলোভনে পড়ে একসময় এক গ্রামের বহু মানুষ বিক্রি করেছিলেন নিজেদের অঙ্গ। নেপালের ঐতিহ্যবাহী হোকসে গ্রামটি তাই পরিচিতি পেয়েছিল ‘কিডনি ভ্যালি’ হিসেবে। দীর্ঘদিনের সেই কালো অধ্যায় কাটলেও তার ভয়াবহ ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন সেখানকার বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের দাবি, দারিদ্র্যের চাপে গ্রামটির প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকেই কেউ না কেউ কিডনি বিক্রি করেছেন। এদেরই দুজন কাঞ্চা ও রাম। অস্ত্রোপচারের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ব্যথায় ভুগছেন কাঞ্চা, যার কারণে তিনি আর কাজ করতে পারছেন না। কাঞ্চা বলেন, "কতজন এমন করেছে, তার হিসাব করা অসম্ভব। এই গ্রাম, ওই গ্রাম, সব জায়গাতেই অনেক মানুষ কিডনি বিক্রি করেছে।"
আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হলেও বছরের পর বছর দালাল চক্র হোকসে এলাকার মানুষকে প্রতারণা ও শোষণের শিকার করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই অনভিপ্রেত অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দারা এই দুর্নাম মুছে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও নেপালের দারিদ্র্য ঘিরে আবারও তৈরি হয়েছে নতুন সংকট।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের ২০২৪ সালের এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে নেপালের এই আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ার আসায় নেপালি যুবকদের একটি অংশ কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, চরম গরম, পানিশূন্যতা ও প্রতিকূল কর্মপরিবেশের কারণে উপসাগরীয় দেশ ও মালয়েশিয়া থেকে কাজ শেষে দেশে ফেরা অনেক শ্রমিকের কিডনি বিকল হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমটির তথ্যানুযায়ী, নেপালের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব লেবার অ্যান্ড মোবিলিটি’ (সিইএসএলএএম) ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নেপাল-ভারত সীমান্ত কেন্দ্রিক কিডনি পাচারের নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হোটেলে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির প্রলোভনে দরিদ্র নেপালিদের ভারতে নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে আটকে রেখে জোড়পূর্বক কিডনি কেটে নেওয়া হচ্ছে।
সিন্ধুলি এলাকার এক ভুক্তভোগী ২০২৫ সালে এই চক্রের কবলে পড়েন। ভালো চাকরির আশায় ভারতে যাওয়ার পর তাকে এক মাস আটকে রাখা হয়। তিনি কিডনি দিতে অস্বীকৃতি জানালে জোরপূর্বক ক্লিনিকে নিয়ে অচেতন করে তার বাম কিডনি কেটে নেওয়া হয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৬ লাখ রুপির বদলে দেশে ফেরত পাঠানোর সময় তার হাতে তুলে দেওয়া হয় মাত্র ১০ হাজার রুপি। অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরে ওই ব্যক্তি ঘটনাটি পরিবারকে জানান এবং পরবর্তীতে নেপালের ‘অ্যান্টি-হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’তে (এএইচটিআইবি) আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন।
নেপালি কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল মানুষকে চাকরির লোভ দেখিয়ে অঙ্গ পাচারচক্রে ফাঁদে ফেলার প্রবণতা দেশটিতে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পুরোনো ‘কিডনি ভ্যালি’র নির্মম ইতিহাস এবং সীমান্তে সক্রিয় নতুন পাচারচক্র- সব মিলিয়ে নেপালের চরম দারিদ্র্য ও মানুষের অসহায়ত্বের করুণ চিত্রই আবার সামনে আনছে।
দেশবার্তা/একে