শীতের আগাম সবজি বাজারে উঠতে শুরু করলেও রাজধানীর খুচরা বাজারে দাম কমেনি। শিম, ফুলকপি ও মুলার মতো নতুন সবজি কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। অধিকাংশ সবজি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ১২০ টাকায়। টমেটো, বেগুন ও শিমের মতো কয়েকটি সবজির দাম আরও বেশি।
অন্যদিকে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী আড়তে তুলনামূলক কম দামে মাছ ও সবজি কিনতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। তাঁদের ভাষ্য, স্থানীয় বাজারের তুলনায় আড়তে কিছু পণ্য কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে পাওয়া যায়। মাছ-মাংসের দাম মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকলেও ডিমের দাম কিছুটা কমেছে।
শুক্রবার রাজধানীর মিরপুর-৬, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও আগারগাঁও এলাকার খুচরা বাজার এবং যাত্রাবাড়ী আড়তের চিত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পরিবারের বাজার করতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ যাত্রাবাড়ী আড়তে আসেন। সেখানে খুচরা ক্রেতাদের পাশাপাশি পাড়া-মহল্লার দোকানিরাও পাইকারি দামে মাছ ও সবজি কেনেন।
রাজধানীর খুচরা বাজারে শীতের আগাম সবজি শিম বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৫০ টাকায়। ফুলকপি প্রতিটি ৭০ টাকা এবং মুলা ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নতুন সবজি বাজারে আসায় দাম কমবে- এমন প্রত্যাশা থাকলেও ক্রেতারা এখনো স্বস্তি পাচ্ছেন না। বেগুন, করলা, বরবটি, ঢ্যাঁড়স, পটল ও কাঁকরোলের মতো পরিচিত সবজির দামও তুলনামূলক বেশি। লম্বা বেগুনের কেজি ১০০ টাকা এবং গোল বেগুন ১২০ টাকা। টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে। বরবটি, ঝিঙে ও করলার দাম কেজিপ্রতি ৮০ টাকা। কচুরমুখিও বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে।
তুলনামূলক কম দামে সাধারণ শসা পাওয়া যাচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। তবে দেশি শসার কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা। পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা কেজি দরে। আকারভেদে প্রতিটি লাউয়ের দাম ৪০ থেকে ৬০ টাকা।
বাজার করতে আসা আবুল কালাম মাহী জানান, তিনি ১৪০ টাকা দিয়ে দুটি ফুলকপি কিনেছেন। নতুন সবজি হওয়ায় বেশি দাম দিয়েও কিনেছেন বলে জানান তিনি। একটি লাউ কিনেছেন ৫০ টাকায়। এ ছাড়া এক পোয়া কাঁচা মরিচ কিনতে তাঁর খরচ হয়েছে ৪০ টাকা।
সবজির বাজারে অবশ্য কাঁচা মরিচের দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। কয়েক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচের দাম ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। সরবরাহ বাড়ায় এখন মানভেদে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজি কিনতে বাড়তি টাকা খরচের পাশাপাশি মাছ-মাংসের বাজারেও ক্রেতাদের স্বস্তি নেই। রাজধানীর খুচরা বাজারে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৮০ টাকায়। সোনালি মুরগির দাম ৩১০ টাকা। গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা।
ব্রয়লার মুরগির বিক্রেতা মাহীন সারওয়ার বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্রয়লার মুরগির দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। এক সপ্তাহে কেজিপ্রতি ১০ টাকা কমলে পরের সপ্তাহে আবার ১০ টাকা বেড়ে যায়। ফলে দাম ঘুরেফিরে ২০০ টাকার আশপাশেই থাকছে। সোনালি মুরগির দামও ৩১০ থেকে ৩২০ টাকার মধ্যে রয়েছে। শুক্রবার তিনি ৩১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন।
ডিমের বাজারে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১০ টাকা কমে ১৪০ টাকায় নেমেছে। চারটি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। কাজীপাড়া এলাকার ডিম বিক্রেতা আলাউদ্দিন জানান, গত সপ্তাহে তিনি ডজনপ্রতি ১৫৫ টাকা দরে ডিম বিক্রি করেছেন।
মাছের বাজারেও গত সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২২০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি দরে। রুই ও কাতলার দাম ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা। মাঝারি আকারের রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বড় রুইয়ের কেজি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
এছাড়া পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, ট্যাংরা ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের কইয়ের কেজি ৩০০ টাকা। পোয়া বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকা কেজি দরে। আকারভেদে চাষের শিং মাছের দাম ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা। চিংড়ির কেজি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে কেজিপ্রতি এক হাজার টাকার বেশি খরচ হতে পারে।
তুলনামূলক কম দামে মাছ ও সবজি কেনার আশায় গতকাল সকালে যাত্রাবাড়ী আড়তে ক্রেতাদের ভিড় দেখা যায়। যাত্রাবাড়ী, দুনিয়া, কদমতলী, দয়াগঞ্জ, কুতুবখালী, শনির আখড়া ও রায়েরবাগসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ সেখানে বাজার করতে আসেন। কেউ পরিবারের সাপ্তাহিক বাজার করেন, আবার কেউ পাড়া-মহল্লার দোকানে বিক্রির জন্য পণ্য কেনেন।
ক্রেতাদের ভাষ্য, স্থানীয় খুচরা বাজারের তুলনায় আড়তে কিছু পণ্য কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা কম দামে পাওয়া যায়। একসঙ্গে বেশি পরিমাণে মাছ ও সবজি কিনলে এই পার্থক্যে কিছুটা সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে, আড়ত থেকে পণ্য কিনে খুচরা বিক্রেতারা পরিবহন খরচ ও নিজেদের লাভ যোগ করে বিক্রি করেন। এ কারণে একই পণ্যের দাম খুচরা বাজারে বেশি পড়ে।
বেসরকারি চাকরিজীবী রায়হান আহমেদ বলেন, তাঁর মহল্লায় ছোট বাজার থাকলেও কিছুটা কম দামে পণ্য পাওয়ার আশায় তিনি যাত্রাবাড়ীতে আসেন। তাঁর ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারি পণ্য এখানে আসে এবং আশপাশের এলাকার বিক্রেতারাও এখান থেকে মাছ ও সবজি নিয়ে যান।
যাত্রাবাড়ী আড়তের সবজি ব্যবসায়ী হারুন আহমেদ বলেন, শুক্রবার তাঁদের বেচাকেনা বেশি হয়। সরকারি ছুটি থাকায় এদিন অনেক ক্রেতা আড়তে আসেন। খুচরা ক্রেতাদের পাশাপাশি পাইকারি ক্রেতারাও পণ্য কেনেন।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যাত্রাবাড়ী আড়তে প্রতি কেজি বোয়াল মাছ ৪০০ থেকে ৪৬০ টাকা, রুই ৩৫০ টাকা, চাষের কই ২০০ টাকা, চিংড়ি ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা, কাতলা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং পোয়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া শিং মাছ ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, চাষের মাগুর ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, পাঙাশ ১৩০ থেকে ১৮০ টাকা এবং পাবদা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে।
আড়তে সবজির মধ্যে করলা কেজিপ্রতি ৬০ টাকা, বেগুন ৭০ টাকা, পটল ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, কুমড়া ৩০ থেকে ৬০ টাকা, টমেটো ১৮০ টাকা, লাউ ৪৯ টাকা, শসা ৫০ টাকা, শিম ১২০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৪০ টাকা এবং কাঁচা মরিচ ১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। কলা বিক্রি হচ্ছে হালিপ্রতি ২০ টাকায়।
তবে আড়ত ও খুচরা বাজারের দামের পার্থক্য সব পণ্যে এক রকম নয়। মাছ ও সবজির ধরন, আকার, মান এবং সরবরাহের ওপর দাম নির্ভর করছে। একই মাছের দাম একেক বাজারে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমবেশি হতে পারে। সব মিলিয়ে আগাম শীতের সবজি বাজারে এলেও রাজধানীর খুচরা বাজারে উচ্চমূল্যের চাপ কমেনি। কিছু পণ্যের দাম কম থাকায় যাত্রাবাড়ী আড়ত সাপ্তাহিক বাজারের জন্য ক্রেতাদের কাছে তুলনামূলক সাশ্রয়ী বিকল্প হয়ে উঠেছে।
দেশবার্তা/এসআইএস/একে