শব্দ ও বায়ুদূষণ রোধে দীপাবলির প্রচারে অভিনেত্রী দিয়া মির্জার অংশগ্রহণ নিয়ে শুরু হওয়া বিতর্কের জেরে তাঁর অভিনীত সচেতনতামূলক ভিডিওটি সমাজমাধ্যম থেকে সরিয়ে নেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বম্বে হাই কোর্ট। আদালত ঘটনাটিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, পুরো বিষয়টি তাদের বিচলিত করেছে এবং ভিডিওটি পুনরায় প্রকাশ করাই হবে আদর্শ পদক্ষেপ।
মুম্বাইয়ের মেয়র ঋতু তাওড়ে এবং বিজেপি সভাপতি অমিত সাটমের আপত্তির মুখে বৃহন্মুম্বাই পৌরসভা (বিএমসি) ভিডিওটি সরিয়ে নেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ, পরিবেশদূষণ রোধে একটি মহৎ উদ্যোগকে অন্য রং দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের সংবিধানের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে ভিডিও ও প্রচারের বিষয়বস্তু পুনরায় প্রকাশ করা প্রয়োজন।
আদালতের মতে, মুম্বাইয়ের সামাজিক সম্প্রীতি ও একসঙ্গে থাকার মানসিকতা কোনো দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
আদালতের নির্দেশে বলা হয়েছে, বৃহন্মুম্বাই পৌরসভার উদ্যোগে বাজি পোড়ানোর ফলে শব্দ ও বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কাজে যে সব তারকা যোগ দিয়েছেন এবং সাহায্য করেছেন, তাদের নিয়ে কয়েক জনের মন্তব্যে আমরা বিচলিত। আমাদের মতে, বিএমসি অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ করেছে। প্রত্যেক তারকাই একসঙ্গে থাকার বার্তা দিয়েছেন। এমন একটি মহৎ উদ্দেশ্যে যখন সকলে উদ্যোগী, তখন সেখানে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কোনো জায়গা ছিল না।
বিচারপতি গিরিশ এস কুলকর্নী ও নীলা কে গোখলের ডিভিশন বেঞ্চ আরও বলে, গতকাল সোমবার যে ঘটনা ঘটেছে, তা আমাদের মতে দুর্ভাগ্যজনক। আদালতের নির্দেশের গুরুত্ব এবং এই প্রচারের মূল উদ্দেশ্য- কোনোটিই বিবেচনায় রাখা হয়নি। বৃহত্তর সমাজের স্বার্থের বিনিময়ে কয়েক জনের হঠকারী প্রতিক্রিয়ার কোনো জায়গা নেই।
উৎসবের সময়ে বাজি পোড়ানোর কারণে শব্দ ও বায়ুদূষণ নিয়ে একটি স্বতঃপ্রণোদিত জনস্বার্থ মামলার শুনানিকালে আদালত এই পর্যবেক্ষণ দেয়। গত ২৬ অক্টোবর আদালত বিএমসিকে নির্দেশ দিয়েছিল, দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির জন্য বিনা পারিশ্রমিকে প্রচারে অংশ নিতে আগ্রহী তারকাদের যুক্ত করতে। সেই নির্দেশ মেনেই পৌরসভা অজিঙ্ক রাহানে, মাধুরী দীক্ষিত ও দিয়া মির্জাকে নিয়ে প্রচার শুরু করে। কিন্তু বিজেপি সভাপতির আপত্তির পর দিয়া অভিনীত ভিডিওটি সরিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় মৌখিকভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত বলেছে, যা ঘটেছে, তাতে আমরা গভীরভাবে ব্যথিত। বিশেষত, যখন বিষয়টি এই আদালতের দেওয়া নির্দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্য কোনো বিষয় টেনে আনার প্রয়োজন ছিল না। যে কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের মানুষ এই প্রচারের বার্তা দিতে পারেন।
আদালতের আরও পর্যবেক্ষণ, সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিবেশ ও শব্দদূষণের মতো বিষয়ে একসঙ্গে থাকার মানসিকতাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বিচারপতিরা বলেন, আদালতের নির্দেশ থেকে কোনো উদ্যোগের সূত্রপাত হলে প্রত্যেকেরই তা সম্মান করা উচিত। বিষয়টিকে অন্য কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়। তারকারা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে এগিয়ে আসছেন, তাতে সমস্যা কোথায়? পরিবেশের বিষয়টিকে অন্য কোনো বিতর্কের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া উচিত নয়। দেশের প্রত্যেক মানুষ একই বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নেন। এটি তো সুপ্রিম কোর্টের সেই পর্যবেক্ষণেরও পরিপন্থী, যেখানে বলা হয়েছিল, সব সম্প্রদায়ের মানুষই উৎসব উদ্যাপন করেন। আমরা কি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ নই? এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
দিয়া মির্জাকে ঘিরে আপত্তির প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিচারপতিরা বলেন, এক ধর্মের মানুষকে অন্য ধর্মের মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। যে অভিনেত্রীকে নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে, তিনি পরিবেশ ও শব্দদূষণ নিয়ে অত্যন্ত ভালো বার্তা দিয়েছেন। বিষয়টিকে অন্য রং দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ছিল না। একজন এই উদ্যোগের ভাবনা দিয়েছিলেন, অন্য জন তা বাস্তবায়িত করেছেন। উচ্চপদে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে এমন আচরণ দুর্ভাগ্যজনক। আমরা কোন দিকে এগোচ্ছি? দয়া করে ভিডিওটি আবার প্রকাশ করুন। সমাজ ও সংবিধানের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনুন। এক-দু’জনের বিচ্ছিন্ন মন্তব্যকে আমরা সমর্থন করতে পারি না।
দেশবার্তা/একে