আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের ভূমিপুত্র বিতর্ক

এ এইচ এম ফারুক

মতামত

প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিকভাবে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ পালিত হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটি বিশ্বের প্রান্তিক ও নিপীড়িত

2026-08-08T15:35:06+06:00
2026-08-08T15:35:06+06:00
রোববার ● ৯ আগস্ট ২০২৬,
২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
 ইপেপার   ভিডিও 

রোববার ● ৯ আগস্ট ২০২৬
চলমান বার্তা:
মতামত
আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের ভূমিপুত্র বিতর্ক
এ এইচ এম ফারুক
প্রকাশ: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৩৫ পিএম 
লেখক: এ এইচ এম ফারুক সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক।
প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিকভাবে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ পালিত হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটি বিশ্বের প্রান্তিক ও নিপীড়িত নৃগোষ্ঠীগুলোর অধিকার রক্ষার বার্তা নিয়ে এলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ বা Indigenous শব্দটির ব্যবহার কেবল একটি শব্দগত বা সাংস্কৃতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এক গভীর ঐতিহাসিক, নৃবিজ্ঞানিক এবং সার্বভৌম ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্নের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে। 

পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে তৎপরতা গত কয়েক দশকে দেখা যাচ্ছে, তা ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ এবং আন্তর্জাতিক আইনের মারপ্যাঁচে দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ডের জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলার শামিল। 

ঐতিহাসিক দলিল, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও নৃবিজ্ঞানের আলোকে বিচার করলে স্পষ্ট দেখা যায় যে, বাংলাদেশের একমাত্র ভূমিপুত্র বা প্রাক-ঔপনিবেশিক আদি বাসিন্দা হলো মূল স্রোতধারা বাঙালি ও তাদের পূর্বপুরুষ অনার্য প্রাকৃতজন।

এক. ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বিচারে বাঙালির প্রাচীনত্ব ও ভূমিপুত্র পরিচয়:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সীমান্তে ‘ভূমিপুত্র’ বা ‘আদিবাসী’ কারা, তা নির্ধারণে প্রাচীন ইতিহাস ও নৃবিজ্ঞানের সাহায্য নেওয়া অপরিহার্য। ঐতিহাসিক বিচারে এ ভূখণ্ডের অবিনশ্বর পলিমাটিতে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা সভ্যতার কারিগর ছিল এ দেশের অনার্য প্রাকৃত জনগোষ্ঠী, যারা কালক্রমে বাঙালি জাতি হিসেবে রূপ লাভ করেছে।

পণ্ডিতজনদের বয়ান:
মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রাসাদ শাস্ত্রী তাঁর অপ্রকাশিত নিবন্ধ 'Bengal, Bengali's, Their manners, customs and Literature'—এ প্রাচীন বাংলার সভ্যতার গৌরবময় ইতিহাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, যখন আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে পাঞ্জাবে এসে পৌঁছায়, তখনও বাংলা এক উন্নত ও সমৃদ্ধ সভ্যতার অধিকারী ছিল। আর্যরা এলাহাবাদ পর্যন্ত বসতি বিস্তার করে বাংলার সমৃদ্ধি ও সভ্যতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে বাঙালিদের ‘ধর্মজ্ঞানশূন্য পক্ষী’ বলে বর্ণনা করেছিল।
ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর 'বাঙালার ইতিহাস' গ্রন্থে হরপ্রাসাদ শাস্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, বুদ্ধদেবের জন্মের বহু পূর্বেই বাঙালিরা জলে ও স্থলে এতটাই পরাক্রান্ত ছিল যে, বঙ্গরাজের ত্যাজ্যপুত্র বিজয় সিংহ সাত শত সঙ্গী নিয়ে নৌপথে লঙ্কাদ্বীপ জয় করেন এবং তাঁর নামানুসারেই সেই দ্বীপের নাম হয় ‘সিংহল’। প্রাচীনকালে লোহা ব্যবহারের পূর্বেও বাঙালিরা বেতে বাঁধা ‘বালাম নৌকায়’ করে নানা দেশে ধান-চাল বিক্রি করতে যেত এবং সেখান থেকেই ‘বালাম চাল’ নামের উৎপত্তি। তাম্রলিপ্ত ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান বন্দর।

খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকে বঙ্গদেশ থেকে ‘লাক-লোঙ’ নামক এক বীর সমুদ্রপথে আনাম (বর্তমান ভিয়েতনাম) গমন করে স্থানীয় রাজাকে পরাজিত করে ‘বন-লাঙ’ নামক রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পন্ডিত জেরিনির মতো প্রখ্যাত গবেষকরা স্বীকার করেছেন যে, আনামের এই ‘বন’ বা ‘বঙ’ জাতি মূলত বঙ্গদেশ থেকেই গিয়েছিল এবং তারা খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক পর্যন্ত সেখানে রাজত্ব করে।

প্রাচীন বঙ্গ সভ্যতা, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও অনার্য শিকড়:
রামায়ণে উল্লেখিত মহাবালী রাজাকে ইতিহাসবিদরা প্রাচীন বাংলার পরাক্রমশালী শাসক হিসেবে শনাক্ত করেছেন। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের পলিমাটির বয়স প্রায় ২০ হাজার বছর। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে সংরক্ষিত কাঠের দুটি নৌকার আনুমানিক বয়স ৩ হাজার বছর এবং পঞ্চগড়ের ভিতরগড় দুর্গের বয়স প্রায় ২ হাজার বছর। ১৮৮৬ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রাপ্ত অশ্মীভূত কাঠের তৈরি নব্যপ্রস্তর যুগের অস্ত্র প্রমাণ করে, বহু হাজার বছর পূর্বেই এ অঞ্চলে মানব বসতি গড়ে উঠেছিল।

ড. রশীদ ও সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতগণের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে প্রাপ্ত ব্রাহ্মী শিলালিপির বহু পূর্ব থেকেই এখানে সুসংগঠিত জনপদ ছিল। বৈদিক সাহিত্যের ঐতরেয় আরণ্যক ও ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ (Aitareya Brahmana 7.6) উল্লিখিত অনার্য ‘পুণ্ড্র’ গোত্র থেকেই বগুড়ার প্রাচীন মহাস্থানগড় বা পুণ্ড্রনগরের নামকরণ হয়েছে।

প্রাচীন ভূগোলে বাংলার ব্যাপ্তি ও সংমিশ্রণ:
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রী রমেশ চন্দ্র মজুমদার তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রাচীন হিন্দু যুগে সমগ্র বাংলা কোনো একক নামে পরিচিত ছিল না; বরং বরেন্দ্র, তাম্রলিপ্ত, সমতট, হরিকেল, বঙ্গ ও বঙ্গাল প্রভৃতি খণ্ডে বিভক্ত ছিল। হেমচন্দ্রের 'অভিধান চিন্তামণি' গ্রন্থ অনুসারে ‘বঙ্গ’ ও ‘হরিকেল’ ছিল একার্থবোধক। বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম মূলত প্রাচীন হরিকেল ও বঙ্গ রাজ্যেরই অবিচ্ছেদ্য ভৌগোলিক অংশ ছিল।
রমেশ চন্দ্র মজুমদার ও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় স্পষ্ট করেছেন যে, আর্যদের আগমনের বহু পূর্বেই অস্ট্রো-এশিয়াটিক বা অস্ট্রিক (যাদের বৈদিক গ্রন্থে ‘নিষাদ জাতি’ বলা হয়েছে) এবং আলপাইন জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে বাঙালি জাতির উদ্ভব ঘটেছিল। বিজ্ঞানী প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশের নৃতাত্ত্বিক পরিমাপও নিশ্চিত করে যে, বাঙালি ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট জাতি।

গঙ্গরিডই জাতির শৌর্যবীর্য:
খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে মেসিডোনিয়ার আলেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমণ করেন, তখন ব্যাসাস, ডিওডোরাস ও প্লিনির মতো গ্রীক ঐতিহাসিকরা গঙ্গা অববাহিকার পরাক্রমশালী ‘গঙ্গরিডই’ (Gangaridai) জাতির উল্লেখ করেন। গ্রীক লেখকদের বিবরণ অনুযায়ী, গঙ্গরিডইদের চার হাজার সুসজ্জিত রণহস্তী ও অপরাজেয় সামরিক শক্তির কথা শুনেই আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী অগ্রসর হওয়ার সাহস হারায়। নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, এই শক্তিশালী সামরিক কাঠামোর অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে প্রাচীন বাংলায় সুবিন্যস্ত রাজ্য ও নাগরিক সভ্যতা বিদ্যমান ছিল।

অতএব, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য-প্রমাণ একবাক্যে নিশ্চিত করে যে, প্রাচীন বঙ্গভূমির অনার্য প্রাকৃতজন—যারা পরবর্তীকালে হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম ধর্মে রূপান্তরিত হয়ে আজকের বাঙালি জাতি হিসেবে বিকাশ লাভ করেছে—তারা এবং কেবল তারাই এই ভূখণ্ডের প্রাক-ঔপনিবেশিক মূল অধিবাসী বা ভূমিপুত্র।

দুই. পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অভিবাসনের ইতিহাস:
পার্বত্য চট্টগ্রাম হলো বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা। ১৮৬০ সালের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম বা বর্তমানের ৩ টি জেলার কোনোটিউ ছিল না। বৃটিশ প্রশাসন তাদের শাসনের সুবিধার্থে ১৮৬০ সালে চট্টগ্রাম জেলার পাহাড়ি এলাকার বৃহদ অংশটি ভাগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামটি সৃষ্টি করে। বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, খিয়াং প্রভৃতি নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হলেও, ঐতিহাসিকভাবে তারা এই ভূখণ্ডের প্রাক-ঔপনিবেশিক আদি বাসিন্দা নয়।

নৃতাত্ত্বিক গঠন ও আদি উৎস:
নৃতাত্ত্বিক বিচারে সমতলের বাঙালিদের সাথে পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীগুলোর দৈহিক গঠনে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, তারা মঙ্গোলীয় মহাজাতির তিব্বতি-বর্মি ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী স্যার হার্বার্ট রিজলি তাঁর গবেষণায় এদের আদি বসতি হিসেবে দক্ষিণ চীন, তিব্বত, মায়ানমার সীমান্ত ও মঙ্গোলীয় মালভূমিকে চিহ্নিত করেছেন।

ঔপনিবেশিক দলিলের তথ্য:
ব্রিটিশ আমলের প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিলসমূহ নিশ্চিত করে যে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নিপীড়ন, গোত্রীয় সংঘাত ও যুদ্ধের কারণে স্থানান্তরিত হয়ে এদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। আর. এইচ. এস হাচিনসন (R. H. S. Hutchinson): ১৯০৬ সালে প্রকাশিত 'Gazetteer of the Chittagong Hill Tracts' গ্রন্থে তিনি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন কীভাবে চাকমা ও মারমারা মায়ানমারের আরাকান এবং ত্রিপুরা রাজ্য থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে বিতাড়িত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে।

ক্যাপ্টেন জে. পি. লুইন (Captain J. P. Lewin): ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত 'The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বেও পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীগুলো যাযাবর জীবনযাপন করত (জুম চাষের স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে) এবং নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডের ওপর তাদের স্থায়ী বা একচ্ছত্র মালিকানা ছিল না। কাজেই, ঐতিহাসিক সত্য এটাই যে, তারা বিভিন্ন শতাব্দীতে বিশেষ করে ১৬ থেকে ১৮ শতকের মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পার্বত্য অঞ্চলে অভিবাসিত হয়েছিল।

তিন. আঞ্চলিক প্রেক্ষিত: ভারত ও মায়ানমারের নীতি
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার যতটা সহজভাবে দেখা হয়, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও কৌশলগত জাতীয় নীতি অনুসরণ করে।

ভারতের স্বাধীনোত্তর অবস্থান ছিল—দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী সকলেই এই মাটির সন্তান। কাউকে এককভাবে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে পরোক্ষভাবে ‘বহিরাগত’ বা ‘সেটলার’ বানানোর ঝুঁকি তৈরি হয়, যা রাষ্ট্রের অখণ্ডতার পরিপন্থী। অন্যদিকে মায়ানমার নিজস্ব ১৩৫টি গোত্রকে নিজস্ব জাতিসত্তা হিসেবে মেনে নিলেও ‘আদিবাসী’ পরিচয় বর্জন করেছে, কারণ তা রাষ্ট্রের ভেতরে পৃথক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের পথ খুলে দেয়।

যে নৃগোষ্ঠীগুলো ভারত বা মায়ানমারে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত নয়, বাংলাদেশে এসে কয়েকশো বছর উপজাতি হিসেবে থেকে এখন আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থা ও বিশেষ কিছু এনজিও-র সহায়তায় তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা একটি দ্বিমুখী ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।

ভূ-রাজনৈতিক সংকট, আইএলও ১৬৯ ও জাতীয় নিরাপত্তা:
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১১ শতাংশ (বা এক-দশমাংশ)। এই কৌশলগত ভৌগোলিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবিটি কেবল একটি নামীয় দাবি নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সুবিধা নেওয়ার এক কৌশল।

আইএলও কনভেনশন ১৬৯ ও অনুচ্ছেদ ৩০-এর ফাঁদ:
২০০৭ সালের জাতিসংঘের ‘আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ (UNDRIP) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১৬৯ নম্বর কনভেনশন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এর ঝুঁকি প্রকাশ পায়। আইএলও কনভেনশন ১৬৯-এর ৩০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী- কোনো ভূখণ্ডে কোনো জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে, তাদের প্রত্যক্ষ সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্র সেখানে কোনো সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা, সেনানিবাস স্থাপন বা নিরাপত্তা চৌকি রাখতে পারবে না।
যদি বাংলাদেশ এই কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করে বা তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়, তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সার্বভৌম কর্তৃত্ব আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। রাষ্ট্র নিজের সীমান্ত রক্ষা বা পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাস দমন করতে আন্তর্জাতিক আদালতের বাধার মুখোমুখি হবে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ ‘ডেথ ট্র্যাপ’ বা মরণফাঁদ।

ভূমির মালিকানা, ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে ও রাজস্ব বঞ্চনা:
সমতলের প্রতিটি ইঞ্চি জমি ভূমিসর্বস্ব জরিপ বা ক্যাডাস্ট্রাল রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে পূর্ণাঙ্গ ভূমি জরিপ সম্পন্ন হতে দেওয়া হয়নি।

ইনকিলাব (২০১০) ও কালের কণ্ঠ (২০২৬)-এ প্রকাশিত বিভিন্ন অনুসন্ধানী নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, ভূমি জরিপ না থাকার কারণে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং পাহাড়ে এক প্রকার প্রথাগত সামন্ততান্ত্রিক ভূমি দখলদারিত্ব টিকে রয়েছে।

দেশের ভূমি নীতি অনুযায়ী “সরকারের এক ইঞ্চি জমির রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই”। সমতলের ন্যায় পাহাড়েও অভিন্ন ভূমি আইন, আধুনিক জরিপ ও দালিলিক স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। আদিবাসী দাবির আড়ালে মূলত ভূমি জরিপের বিরোধিতা করা হয়, যাতে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও আইনি নিয়ন্ত্রণ সেখানে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে।

১৯৭১ সালে লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে এবং পরবর্তী সংশোধনীতে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আমাদের সংবিধানে প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যা রাষ্ট্র অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছে।

তবে সাংস্কৃতিক সুরক্ষার নাম করে ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করার সুযোগ নেই। ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও নৃতাত্ত্বিক দলিল প্রমাণ করে—বাংলাদেশের একমাত্র প্রাক-ঔপনিবেশিক মূল জনধারা হলো বাঙালি ও অনার্য প্রাকৃত সমাজ। পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ও পূর্ণ অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক, কিন্তু তারা ঐতিহাসিকভাবে এই ভূমির ‘আদিবাসী’ নয়, বরং বিভিন্ন সময়ে আগত অভিবাসী।

ভারত ও মায়ানমার যে ঐতিহাসিক সত্য ও ভূ-রাজনৈতিক সুরক্ষার স্বার্থে ‘আদিবাসী’ তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করেছে, সার্বভৌম বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই একই অবস্থান বজায় রাখা জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১% ভূমিতে রাষ্ট্রের পূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রাখা, দ্রুত ভূমি জরিপ সম্পন্ন করা এবং সমগ্র দেশে অভিন্ন আইনি কাঠামো বজায় রাখাই স্বাধীন বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার একমাত্র পথ।

দেশবার্তা/আরএইচ


সর্বশেষ সংবাদ 

সংবাদ প্রকাশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রাস্তার সংস্কার কাজ শুরু
হাসিনার নির্দেশে গুম করা হয়েছিল সালাহউদ্দিন আহমদকে: তদন্ত সংস্থা
চুরির অপবাদে দুই বোনকে গাছে বেঁধে নির্যাতন, গ্রেপ্তার ২
পিউরো পেস্ট্রি অ্যান্ড বেকারির ১৬তম আউটলেট উদ্বোধন
১৮ বছরের ক্যারিয়ারে ৩৯টি ক্লাব বদল

সর্বাধিক পঠিত 

ডিসি পদ পেতে ৬৯ কোটি টাকার চুক্তির অভিযোগ
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার পিরোজপুর জেলা কমিটি অনুমোদন
শুরুতে ১২০ টাকা পারিশ্রমিক পেতেন মারিয়া নূর
নাটোরে আবাসন ও চিকিৎসাসহ ট্যুরিজম হাব তৈরি করা হবে
সিলেটে বাস দুর্ঘটনায় বাউল শিল্পী পেহেলী ভৈরবীর মৃত্যু
মতামত- এর আরো খবর 
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক অফিস: গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম একে খন্দকার সড়ক, মহাখলী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১২।
www.thedailydeshbarta.com
Mobile: 01816-185722, Email: [email protected]