ঘরের কোণে কিংবা রান্নাঘরে সামান্য একটি তেলাপোকা ডানা মেললেই অনেক নারী আতঙ্কে শিউরে ওঠেন বা লাফিয়ে দূরে সরে যান- এমন দৃশ্য গৃহকোণে খুব সাধারণ। অথচ সেই একই নারী নিজের চেয়ে বহুগুণ বড় কোনো পোষা বিড়ালকে পরম ভালোবাসায় কোলে তুলে নেন, কোলে বসিয়ে আলতো আদর করেন আর খুঁজে নেন মানসিক প্রশান্তি।
আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি বেশ বৈপরীত্যপূর্ণ মনে হতে পারে- ছোট পোকা দেখে তীব্র ভয়, অথচ তুলনামূলক বড় প্রাণীকে এত অনুরাগের সঙ্গে কাছে টেনে নেওয়া! মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নারীদের এই আচরণের পেছনে মূলত কাজ করে মানব মস্তিষ্কের চেনা নিরাপত্তাবোধ, আচরণগত পূর্বাভাস ও দীর্ঘদিনের সংবেদনশীলতার সহজ মনস্তত্ত্ব।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, ভয় এবং প্রেম সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার দুটি মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি। ভীতি জন্ম নেয় অনিশ্চয়তা ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে, আর ভালোবাসা গড়ে ওঠে নিয়মিত দেখভাল, নিরাপত্তা ও ইতিবাচক অনুভূতি থেকে।
নারীরা যে কারণে তেলাপোকা দেখলে আতঙ্কিত হন
মানুষের মস্তিষ্ক সবসময়ই সম্ভাব্য ঝুঁকি বা বিপদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। তেলাপোকা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণী, যার নড়াচড়া অত্যন্ত দ্রুত এবং অপ্রত্যাশিত। এটি কোন দিকে ছুটবে বা কখন উড়ে এসে গায়ে পড়বে, তা আগে থেকে অনুমান করা অসম্ভব। এই পূর্বাভাষহীন গতিবিধি মস্তিষ্কে হঠাৎ ঝেঁকে বসা আতঙ্কের বার্তা পাঠায়। এর সঙ্গে যোগ হয় দীর্ঘদিনের সামাজিক ধারণা।
শৈশব থেকেই নারীরা শুনে আসছেন তেলাপোকা ক্ষতিকর, অপরিচ্ছন্ন ও জীবাণুবাহী। ফলে প্রাণীটি সরাসরি শারীরিকভাবে বড় কোনো আঘাত না করলেও, মস্তিষ্কের পুরোনো স্মৃতি ও সংস্কারের কারণে নারীরা দ্রুত ভীতি ও অস্বস্তিতে ভুগে থাকেন।
বিড়াল যেভাবে জয় করে নেয় নারীদের মন
বিড়ালের ক্ষেত্রে পুরো বিষয়টি ঘটে ঠিক বিপরীতভাবে। ঘরের বিড়ালের প্রতিদিনের গতিবিধি, মিউ মিউ ডাক, খাওয়ার আবদার কিংবা ঘুমানোর অভ্যাসগুলোর সঙ্গে একজন নারী খুব ভালোভাবে পরিচিত থাকেন।
মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত, যেকোনো বিষয়ের স্পষ্ট চেনা রূপ মানুষকে মানসিকভাবে সুরক্ষিত বোধ করায়।
বিড়ালের পরিচর্যা, তাকে খাওয়ানো কিংবা তার সঙ্গে প্রতিদিন সময় কাটানোর ফলে নারীদের মধ্যে এক গভীর আবেগীয় বন্ধন গড়ে ওঠে। এর ফলে বিড়ালটি আর কেবল সাধারণ কোনো প্রাণী থাকে না, হয়ে ওঠে পরিবারেরই অত্যন্ত প্রিয় একজন সদস্য। এর উপস্থিতিতে মন হালকা হয় এবং মানসিক চাপ কমে আসে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয় পেয়ে কিংবা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বিড়ালকে জোর করে ধরে রাখা অনুচিত। কোনো বিড়াল যদি অসন্তুষ্ট হয়ে সরে যেতে চায়, তবে তাকে নিজস্ব শান্ত পরিবেশ দেওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম টাইমস ম্যাগাজিন, সাইকোলজি টুডে এবং দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর তথ্যমতে, অচেনা ও আচমকা কোনো উদ্দীপকে মস্তিষ্কের সতর্ক হয়ে যাওয়া এবং পরিচিত পরিবেশের কাছে স্বস্তি খোঁজা অত্যন্ত স্বাভাবিক মানবীয় বৈশিষ্ট্য। তাই তেলাপোকা দেখে ভীত হওয়া আর পোষা বিড়ালকে স্নেহে আগলে রাখার মাঝে নারীদের মানসিকতার কোনো দ্বিমুখী আচরণ নেই; বরং এটি মানুষের নিরাপত্তাবোধ ও ভালোবাসারই একটি সহজাত বৈজ্ঞানিক প্রকাশ।
দেশবার্তা/একে