আজ ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। ‘আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা ও অস্তিত্ব সংরক্ষণে আদিবাসী সমাজের সৃজনশীল শক্তি প্রয়োগ করা’ প্রতিপাদ্যে বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য ও জীবনধারা সংরক্ষণের দাবিকে সামনে রেখে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে পালিত হয়েছে দিবসটি।
দিবসটি উপলক্ষে রোববার (৯ আগস্ট) সকালে বান্দরবানের ঐতিহাসিক রাজার মাঠে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পরে দুপুরে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাজার মাঠে গিয়ে শেষ হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কেএস মং।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কেএস মং বলেন, পার্বত্য চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী অঞ্চলের স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করে একটি স্বশাসিত শাসনকাঠামো তৈরি করা। আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদ গঠন এর উদাহরণ। কিন্তু চুক্তির ৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও এর মূল বিষয় ভূমি সমস্যা নিষ্পত্তি এখনো ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “আজ বান্দরবানের এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে একজন আদিবাসী ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, কী কারণে চুক্তির ৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও চুক্তির মূল বিষয় ভূমি সমস্যা নিষ্পত্তি এখনো ঝুলন্ত অবস্থায় আছে।”
এ সময় বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বান্দরবান পার্বত্য জেলার সভাপতি ডা. মং উষাথোয়াই, আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক কৃপা ত্রিপুরা, গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী রিপন চক্রবর্তীসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন নেতা উপস্থিত ছিলেন।
বান্দরবান পাহাড়, নদী ও বনভূমির বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি জেলা। মারমা, চাকমা, ম্রো, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খুমি, খিয়াং, চাক, পাংখোয়া, লুসাইসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস এ জেলায়। তাদের নিজস্ব ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, নৃত্য, গান, উৎসব ও জীবনধারা বান্দরবানের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
তবে দিবসটি শুধু সাংস্কৃতিক উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর কাছে এটি তাদের অস্তিত্ব, পরিচয় ও অধিকার নিয়ে কথা বলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিকার, প্রাকৃতিক সম্পদ, মাতৃভাষায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশেষ করে ভূমির অধিকার বান্দরবানের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পূর্ণাঙ্গ ভূমির অধিকার না পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
অন্যদিকে আধুনিকতার প্রভাব, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য শহরমুখী প্রবণতা এবং মাতৃভাষা চর্চার সংকটের কারণে নতুন প্রজন্মের মধ্যে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে স্থানীয়দের।
বান্দরবানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য শুধু পাহাড়ের মানুষের নিজস্ব সম্পদ নয়, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। তাই আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, উৎসব ও আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি তাদের অধিকার, সংস্কৃতি, ভাষা ও ভূমি সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দিবসটি ঘিরে বান্দরবানের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা, নিজস্ব পরিচয় ও সংস্কৃতি নিয়ে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা।
প্রতিনিধি/আরএইচ