কোতোয়ালী থানায় র্যাবের দায়ের করা একটি অস্ত্র মামলায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) কর্মকর্তা আলমগীর খানকে অভিযুক্ত করে ২০১২ সালে আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্র মামলাটিতে আলমগীর খানকে অভিযুক্ত করে তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। আদালত ২০১২ সালে ওই অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন।
অভিযোগপত্রে নাম আসার পরও একজন কর্মকর্তা কীভাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে আসছেন, তা নিয়ে সিডিএর প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কোনো কর্মকর্তা ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল, সে প্রশ্নও উঠেছে।
এদিকে অস্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়েও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চাকরিতে বহাল আছেন আলমগীর খান। দুই মাস কারাভোগ করেও তাঁকে একদিনের জন্যও বরখাস্ত করা হয়নি। নিয়মিত বেতন পাওয়ার পাশাপাশি মামলার অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত থাকা অবস্থায় তিনি ১১তম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে পদোন্নতিও পেয়েছেন।
২০১১ সালে কোতোয়ালী থানায় দায়ের করা র্যাবের একটি অস্ত্র মামলায় আলমগীর খানকে অভিযুক্ত করে ২০১২ সালে আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সিডিএ।
সূত্র জানায়, কোতোয়ালী থানায় দায়ের করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০১১ সালে নগরের স্টেশন রোডে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানোর জন্য একটি চক্র অবস্থান নেয়। র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালিয়ে গেলেও আলমগীর খানের মালিকানাধীন গাড়ি থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে র্যাব।
পরে গাড়ির নম্বর ধরে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় এজাহার দাখিল করেন র্যাবের তৎকালীন ডিএডি মো. আব্দুল গাফফার। একই বছরের শেষের দিকে সিডিএর তৎকালীন এস্টেট অফিসার আলমগীর খানকে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, এজাহারনামীয় চট্টগ্রাম মেট্রো-গ-১২-২২৬১ নম্বর গাড়ির মালিক আলমগীর খানসহ অজ্ঞাতনামা দুজনের বিরুদ্ধে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯(এ) ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তবে অজ্ঞাতনামা দুজনের ঠিকানা না পাওয়ায় আলমগীর খানের বিরুদ্ধে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনে অভিযোগ গঠনের সুপারিশ করা হয়।
মামলা চলমান থাকা অবস্থায় তিনি দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে আটক করার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। পরে ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠান। দুই মাসের বেশি কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলেও মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) সহকারী সচিব ও সাবেক এস্টেট অফিসার মো. আলমগীর খানের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হয়। একই সঙ্গে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে যোগাযোগ করে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিষদের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সেলিম চৌধুরী বলেন, সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হলে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিচারিক আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হলে বা তিনি গ্রেপ্তার হলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে। বিচার শেষে অভিযোগ প্রমাণিত না হয়ে খালাস বা অব্যাহতি পেলে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাঁকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) সিবিএ সভাপতি ফয়েজ আহম্মদ বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ ধরনের একটি নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। ওই সময়ে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে বিষয়টি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলকে অবহিত করা হয়নি। ফলে ঘটনাটি দীর্ঘদিন আড়ালে থেকে গেছে। বর্তমানে এ-সংক্রান্ত কোনো নথি বা ফাইল দপ্তরে আদৌ সংরক্ষিত আছে কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) অর্থ ও প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্বক্ষণিক সদস্য (অতিরিক্ত সচিব) নুরুল্লাহ নূরী বলেন, “বিষয়টিতে কোনো আইনগত জটিলতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রতিনিধি/আরএইচ