| চলমান বার্তা: |

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বরের ফিউচার ১ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের অক্টোবরের ফিউচার ১ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে ১০২ দশমিক ৬৮ ডলারে পৌঁছেছে।
তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে মূল উদ্বেগ সরবরাহ। সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন জোটের দাবি, সোমবার হুথি বাহিনী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ১৩ জন বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জোটটি।
এরই মধ্যে সৌদি আরবের তেল পরিবহন অবকাঠামো নিয়ে তৈরি হয়েছে বাড়তি উদ্বেগ। ইরাক থেকে উৎক্ষেপিত একটি ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটি ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে। পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে এই পাইপলাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের বিকল্প পথ হিসেবে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। ফলে পাইপলাইনটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে শুধু সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ব্যবস্থাই নয়, বৈশ্বিক বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়বে।
অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছে তারা একটি উন্নত মার্কিন চালকবিহীন আকাশযান ধ্বংস করেছে। উপসাগরীয় জলসীমায় মার্কিন চালকবিহীন নৌযানের বিরুদ্ধে তেহরানের ধারাবাহিক সামরিক তৎপরতার মধ্যেই এ ঘটনা ঘটল।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে জলপথটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আর সেই আশঙ্কাই সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত ঘিরে ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত রোববার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর এমন বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং সরবরাহপথে বিঘ্নের প্রভাব শুধু তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। তেলের দাম বাড়লে প্রথম ধাক্কা লাগে পরিবহন খাতে। এরপর বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, কৃষি ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যের দামে।
শ্রী-কুমার গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিসের প্রেসিডেন্ট কোমল শ্রী-কুমার সতর্ক করে বলেছেন, তেলের অবকাঠামোয় হামলা এবং সৌদি আরবের পাইপলাইন বন্ধ থাকার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। সিএনবিসির ‘স্কোয়াক বক্স এশিয়া’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় আঘাত এবং সৌদি পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব পণ্যের দামে পড়বে।
তাঁর মতে, এর সঙ্গে চলমান শুল্কযুদ্ধ যুক্ত হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। বাণিজ্যিক শুল্ক বাড়তে থাকলে উৎপাদন ও আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। এর ফলে পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে। এমনকি বন্ডের সুদের হারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের বাজারের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিস্তার। সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা এবং তেল পরিবহন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা একই সময়ে ঘটছে। এসব ঘটনার কোনো একটি দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবহন ও উৎপাদন খরচও বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে মূল্যস্ফীতিতে।
বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। জ্বালানি আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে এসব দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। আগামী দিনগুলোতে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা কোন দিকে যায়—আন্তর্জাতিক তেলবাজারের গতিপথ অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করবে।
দেশবার্তা/এমআর
