কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি বৈশ্বিক তদারকি সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ২০টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যাতে মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি মানদণ্ড নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের জন্য এই সংস্থা গঠনের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সোমবার এ বিষয়ে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে দ্রুত অগ্রসরমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বনেতাদের আলোচনার প্রস্তুতির মধ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হলো।
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাবের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ঘোষণাপত্রে সরকার ও শিল্পখাতকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এআইকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে বিকশিত করতে হবে এবং এটি যেন ‘মানবীয় নির্দেশনা, তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে’ থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এআইয়ের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে শিল্পখাত, সরকার ও সমাজকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকি মোকাবিলা ও তদারকি জোরদার করার পাশাপাশি এআইয়ের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে ব্যবধান যাতে না বাড়ে, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঘোষণাপত্রে দেশগুলোকে সাধারণ মানদণ্ড তৈরি ও সমন্বয়, গুরুতর নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনার প্রতিবেদন আদান-প্রদান এবং মানদণ্ড নির্ধারণ ও যাচাইয়ের সক্ষমতা তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি এআইয়ের সক্ষমতা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে দেশগুলোকে একত্রিত করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গার স্টোর, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন, কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দুই এআই শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এই বিবৃতিতে যোগ দেয়নি। তবে অন্যান্য দেশকে এতে যুক্ত হওয়ার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় নেই এআই-সংশ্লিষ্ট অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স।
এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো সরাসরি শীর্ষ বৈঠকে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে বসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সেখানে এআই নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় থাকা ওয়াশিংটন ও বেইজিং- উভয় দেশই এআইয়ের উন্নয়ন ধীর করার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। এই আহ্বানের মূল লক্ষ্য ছিল এআইয়ের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা।
শিল্পখাতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এআই প্রযুক্তির উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানানোর পর নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র বিতর্কের মধ্যেই এই ঘোষণা এলো। চলতি মাসের শুরুর দিকে এক নিবন্ধে ‘অ্যানথ্রপিক’ এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদি ঝুঁকি কমাতে এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানান। পরে ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান এবং স্পেসএক্স ও টেসলার সিইও ইলন মাস্কের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের প্রধানরাও তাকে সমর্থন করেন।
এআই মডেলগুলোর অননুমোদিত ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার কয়েকটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমোদি এই আহ্বান জানান। এর মধ্যে জুলাইয়ের একটি ঘটনায় ওপেনএআইয়ের পরীক্ষাধীন এআই এজেন্ট ‘হাগিং ফেস’ নামের একটি এআই স্টার্টআপ হ্যাক করে ফেলেছিল।
সোমবার শিল্পখাতের পক্ষ থেকে সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে ওপেনএআই জানায়, উন্নত এআইয়ের জন্য কারিগরি মানদণ্ড তৈরির আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়া উচিত।
সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি এক ব্লগ পোস্টে বলেছে, এআই শিল্পে কারিগরি উৎকর্ষের শীর্ষে থাকায় এবং অর্থায়ন, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও তথ্যব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অবস্থান রয়েছে।
ওপেনএআই আরও বলেছে, নেতৃত্বের বিষয়টি নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক এআই কাঠামোকে নিজের মতো করে গড়ে তুলবে, নাকি এর চারপাশে একটি খণ্ডিত, অসম ও সংঘাতপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
জাতিসংঘ-সমর্থিত ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্টিফিক প্যানেল অন এআই’ও সোমবার নতুন সুরক্ষাব্যবস্থা বা ‘গার্ডরেল’ তৈরির আহ্বানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। ‘হাগিং ফেস’-এর ঘটনাটি পর্যালোচনা করা প্যানেলটি জানায়, ওই সাইবার হামলা বিদ্যমান সুরক্ষাব্যবস্থার অকার্যকর হয়ে পড়ার বিষয়টি উন্মোচন করেছে।
দেশবার্তা/এমআর