বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক বাছাইপর্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বিদেশি রেফারি ও ম্যাচ কমিশনারদের জন্য সেক্সুয়াল সার্ভিস (যৌনসেবা) ব্যবস্থা করার অভিযোগে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (কেএফএ)।
প্রায় ১৫ বছর আগের একটি ঘটনার তথ্য সামনে আসার পর দেশটির ফুটবল প্রশাসন নতুন করে বড় বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম জেটিবিসি জানায়, ২০১৬ সালে পরিচালিত একটি সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, ২০১১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে অনুষ্ঠিত সাতটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে দায়িত্ব পালন করা বিদেশি রেফারি ও ম্যাচ কমিশনারদের জন্য কেএফএ যৌনসেবার খরচ বহন করেছিল। অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট রেফারিরা ছিলেন জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও উজবেকিস্তানের।
ওই সময় দক্ষিণ কোরিয়া সাত ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতে জয় পায় এবং দুটি ম্যাচ ড্র করে। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচগুলোর মধ্যে ছিল ২০১২ লন্ডন অলিম্পিক বাছাইয়ে ওমানকে ২-০ গোলে হারানো, কাতারের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র এবং ২০১৪ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কুয়েতের বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়।এই ফলাফলের কারণে অভিযোগ উঠেছে, অনৈতিক আতিথেয়তার মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া ক্রীড়াগত সুবিধা পেয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জাপানের ফুটবল সাময়িকী দ্য ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন এক প্রতিবেদনে লিখেছে, আন্তর্জাতিক ম্যাচের দায়িত্বে থাকা রেফারিদের এমন অনুপযুক্ত আতিথেয়তা দেওয়া নিজেই খেলাধুলার ন্যায্যতা ও নৈতিকতার পরিপন্থী। এটি শুধু কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের জন্য বড় ধাক্কা নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
আরেক জাপানি সংবাদমাধ্যম সাকানোয়া সতর্ক করে বলেছে, এই ঘটনায় জাপানি রেফারিদের নাম জড়িয়ে থাকলে দুই দেশের ফুটবল সংস্থার সম্পর্কেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্লেষকরাও বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন।
ফুটবল বিশ্লেষক পার্ক মুন-সুং বলেন, এটি দেখায়, তখনকার ফুটবল প্রশাসনের চিন্তাধারা কতটা সেকেলে ও অগ্রহণযোগ্য ছিল। বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
২০০২ সালে জাপানের সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের সময়ও দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে রেফারিং হয়েছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আলোচিত। নতুন এই অভিযোগ সেই পুরোনো বিতর্ককেও আবার সামনে নিয়ে এসেছে।তবে ঘটনাটি অনেক পুরোনো হওয়ায় আনুষ্ঠানিক শাস্তির সম্ভাবনা খুবই কম। ফিফার নৈতিকতা বিধিমালায় এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ বছরের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একই সঙ্গে ফৌজদারি আইনের অধীনেও অভিযোগের সময়সীমা ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে।
কেএফএ জানিয়েছে, তাদের নথি সংরক্ষণের মেয়াদ পাঁচ বছর হওয়ায় ১৫ বছর আগের সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখন আর সংরক্ষিত নেই। এছাড়া বর্তমানে 'ক্লিন কার্ড সিস্টেম' চালুর মাধ্যমে বিনোদনকেন্দ্রে এ ধরনের ব্যয় সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অভিযোগের সময় কেএফএর সভাপতি ছিলেন চো চুং-ইউন, যিনি ২০১৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার উত্তরসূরি ছিলেন চুং মং-গ্যু। তার দায়িত্বকালেই ২০১৬ সালের সরকারি নিরীক্ষায় এই তথ্য উঠে আসে।
এরই মধ্যে আরেকটি বিতর্কেও জড়িয়ে পড়েছে কেএফএ। ২০২৪ সালে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে হং মিয়ুং-বোকে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে পুলিশ। সেই তদন্তের অংশ হিসেবে সম্প্রতি কেএফএর কার্যালয়ে তল্লাশিও চালানো হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত হং মিয়ুং-বো, সাবেক সভাপতি চুং মং-গ্যু বা সাবেক টেকনিক্যাল ডিরেক্টর লি লিম-সেংয়ের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, তবুও একের পর এক বিতর্ক দক্ষিণ কোরিয়া ফুটবলের ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে।
দেশবার্তা/এমআর