৩৩ বছর পর নগরীতে আরেকটি অত্যাধুনিক বাস টার্মিনাল চালু হতে যাচ্ছে। তৃতীয় বাস টার্মিনালটি উত্তর চট্টগ্রামের যানজট কমাতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কুলগাঁওয়ে নির্মাণ করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। বাস-ট্রাক টার্মিনালটি চলতি নভেম্বরই উদ্বোধনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
টার্মিনাল চালু হলে যানজট ও জনদুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কা করছে।টার্মিনালের প্রবেশ পথে সড়কের পাশে রয়েছে বড় বড় পাঁচটি পোশাক কারখানা রয়েছে।এসব কারখানায় ছুটির সময় ওই এলাকায় এমনিতেই যানজট তৈরি হয়। ফলে উত্তরাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সড়কটি এমনিতেই অত্যন্ত ব্যস্ত। প্রতিদিন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের চলাচলে সড়কটিতে যানবাহনের চাপ থাকে।
এর মধ্যে নতুন টার্মিনালকে কেন্দ্র করে শতাধিক বাস ও ট্রাকের নিয়মিত চলাচল শুরু হলে সড়কের যানজট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের যাতায়াত, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়া এবং পোশাক কারখানার শ্রমিকদের কর্মস্থলে যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।চালুর আগে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক, প্রশস্ত প্রবেশপথ ও সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা না থাকায় উল্টো নতুন করে যানজটের আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী ।
চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত সভা ও বৈঠকে আমরা বারবার উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সম্ভাব্য যানজট, জনদুর্ভোগ এবং সড়কের ধারণক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের এসব উদ্বেগ ও প্রস্তাবের বিষয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না।
এমনিতেই উত্তরাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ এ সড়কটি সাধারণত যানবাহন অত্যন্ত ব্যস্ত থাকে। এর সঙ্গে শতাধিক বাস-ট্রাকের চলাচল যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা।আমরা বিভিন্ন মিটিংয়ে বলে আসতেছি এ নিয়ে করো মাথাব্যাথাই নেই।
প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, বিকল্প প্রবেশ ও বের হওয়ার সড়ক এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করে টার্মিনালটি চালু করা হলে জনসাধারণের প্রত্যাশিত সুফলের পরিবর্তে ভোগান্তিই বাড়তে পারে।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের অক্টোবরে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির নির্মাণকাজ এখন শেষ পর্যায়ে। নভেম্বর শেষদিকে টার্মিনালটি চালুর কথা রয়েছে। তবে টার্মিনাল চালুর আগেই এর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং আশপাশের সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কুলগাঁও এলাকার বাসিন্দা নুরুল আবছার বলেন, টার্মিনালের সামনে ও আশপাশে পাঁচটি পোশাক কারখানা, স্কুল-কলেজ ও বাজার রয়েছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। টার্মিনাল চালু হলে যানজট বাড়তে পারে। তাই আগে থেকেই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সড়ক প্রশস্ত করার দরকার।তিনি আরও বলেন, কুলগাঁও সিটি করপোরেশনের টার্মিনালটিতে একসঙ্গে ১৬০টি বাস ও ট্রাক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
দূরপাল্লার পাশাপাশি আন্তঃনগর রুটের বাসও এখান থেকে চলাচল করবে।অক্সিজেন-হাটহাজারী মহাসড়কটি উত্তর-দক্ষিণমুখী। এর পূর্ব পাশে টার্মিনাল নির্মাণ করা হলেও মহাসড়কের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উত্তর ও দক্ষিণমুখী পৃথক কোনো সংযোগ সড়ক তৈরি করা হয়নি। টার্মিনালের সিভিল কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলে, চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুর রশিদ ভৃঁইয়া বলেন, মূল ভবনের কাজ প্রায় শেষ।
বাগান ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও শেষ। আমরা আশা করছি টার্মিনালটির ব্যবহার শুরু হলে সুবিধা পাবে দেশের দুই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির লাখো বাসিন্দা। এতে চট্টগ্রাম নগরীর প্রবেশমুখ অক্সিজেন এলাকার নিত্যদিনের যানজটের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে নগরবাসী।টুকটাক রিপারিং কাজ আছে সাপ্তাহকানির মধ্যেই শেষ হইয়ে যাবে।ইলেকট্রিকের কাজ শেষ হইলে,নভেম্বর মাসে শেষদিকে চালুর আশা করা হচ্ছে।
টার্মিনাল চালুর পর কোনো সমস্যা দেখা দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিছু জমি অধিগ্রহণ এখনও বাকি রয়েছে। সেগুলো সিডিএ একোয়ারে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।এখানে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের বিষয়ও রয়েছে। চালুর পর সমস্যা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামে যানজট নিরসন ও যাত্রীসেবার মান বাড়াতে নগরে নির্মিত হয়েছে তৃতীয় সিটি বাস টার্মিনাল।
এ টার্মিনাল চালু হলে সড়কে বিশৃঙ্খল পার্কিং ও অবাধে যাত্রী ওঠানামা কমে আসবে। এতে নগরের প্রবেশপথে প্রতিদিনের যানজট পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে। ইলেকট্রিকের কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলে, চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী ( বিদ্যুৎ) মুহাম্মাদ শাফকাত বিন আমিন বলেন, আমরা টেন্ডার পকিয়া শেষ করেছি শিগগিরই কাজ শুরু করবো। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম নগরীর প্রথম বাস টার্মিনাল নির্মিত হয় কদমতলীতে।
দ্বিতীয় টার্মিনাল নির্মিত হয় বহদ্দারহাটে ১৯৯৩ সালে। এরপর দীর্ঘ ৩৩ বছরেও নির্মাণ হয়নি কোনো বাস টার্মিনাল। সিটি বাস টার্মিনাল প্রকল্পটি ২০১৮ সালের অক্টোবরে অনুমোদন হয়। নানা জটিলতায় দীর্ঘ কয়েক বছরের বেশি সময়েও প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি চসিক।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) করা চট্টগ্রাম সিটি মাস্টার প্ল্যানে কুলগাঁও এলাকায় মোট ২৮ একর জমিতে একটি বাস টার্মিনাল নির্মাণের জন্য জায়গা বরাদ্দ রাখা হয়। তবে চসিক প্রাথমিকভাবে ১০ একর জায়গায় উন্নয়ন করে টার্মিনাল নির্মাণ করছে। প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের ১৩০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছিল এর মধ্যেই ১০৩ কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, ভূমি উন্নয়নে ৩ দশমিক ৩৭ কোটি টাকা,
অবকাঠামো উন্নয়নে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ ইয়ার্ড নির্মাণে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এই টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার ও আন্তঃনগর উভয় ধরনের বাসই ছাড়বে। টার্মিনালটিতে মোট ১৬০টি বাস-ট্রার্ক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।প্রগতি এন্টারপ্রাইজ শাহ আমানত সিন্ডিকেট, এটিএমবি প্রকল্পের যৌতভাবে কাজ করছেন। যা থাকছে টার্মিনালে একটি ৩ তলা সুদৃশ্য ভবন থাকবে।
এছাড়া, একটি সিটি বাস টার্মিনাল, একটি আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল, ২৫টি যাত্রী বোর্ডিং লেন, ১৪টি অতিরিক্ত ওয়েটিং লেন, একটি বড় খোলা হল রুম এবং তথ্যকেন্দ্র, পুরুষ ও নারীদের জন্য টয়লেট, ২২টি টিকিট কাউন্টার, যাত্রীদের জন্য বিশেষ সুবিধা, এসি বাসের যাত্রীদের বসার জায়গা, বাস-ট্রাক মালিকদের জন্য অফিস কক্ষ থাকবে।
উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বাস চলাচল করে।দীর্ঘদিন অক্সিজেন মোড়সহ আশপাশের সড়কের ওপর দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে। এতে ওই এলাকায় যানজট দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি ছিল। এই সংকট কমানোর লক্ষ্যেই কুলগাঁওয়ে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় চসিক।
দেশবার্তা/জেএ