একনেক থেকে অনুমোদিত সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) প্রকল্প হঠাৎ অন্যত্র স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন উপজেলাবাসী।
রোববার বেলা ১২টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার কাছে এই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আবুল কালাম আজাদ, তাহিরপুর উপজেলা শ্রমিকদল সভাপতি ফেরদৌস আলম, উপজেলা বিএনপির সাবেক সেক্রেটারি রুহুল আমীন, টিটিসি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান উজ্জ্বল, যুগ্ম আহ্বায়ক মু. সফিকুল ইসলাম, পৌর শ্রমিককল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি জসিম উদ্দিন, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর জেলা সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ, টিটিসি বাস্তবায়ন পরিষদের সদস্য সচিব মো. সুহেল আলম, হাওর বাঁচাও আন্দোলনের উপজেলা সেক্রেটারি তোজাম্মিল হক নাসরুম, সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান রাজু, হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম, সাংবাদিক বাবরুল হাসান বাবলু, এসএম মিজানুর রহমান উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুল হাসান রাসেল, বিএনপি নেতা দ্বীন মোহাম্মদ, সাঈদুল কিবরিয়া, এনসিপি নেতা সায়মন আহমদ প্রমুখ।
জানা যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও শিক্ষা—চাকরির দিক থেকে চরমভাবে পিছিয়ে থাকা তাহিরপুর উপজেলা থেকে একনেকে অনুমোদিত টিটিসি প্রকল্প সরিয়ে নেওয়ার খবরে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। বঞ্চিত জনপদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন যেন আবারও ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
উপজেলায় প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষের বসবাস থাকলেও তাহিরপুরে নেই কোনো স্নাতকোত্তর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মাত্র দুইটি কলেজে স্নাতক (পাস) কোর্স চালু রয়েছে। একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষক সংকটে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলায় রয়েছে দুইটি আলিম ও দুইটি দাখিল মাদরাসা। তবে নেই কোনো ফাজিল বা কামিল মাদরাসা। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো এখানে সরকারি বা বেসরকারি কোনো কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রই নেই।
উপজেলার অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর ও প্রবাসমুখী। বছরে মাত্র একটি বোরো ফসল হয়। ধান রোপণ ও কাটার মৌসুম ছাড়া শ্রমিকদের কাজই প্রায় থাকে না। বালু ও কয়লা শ্রমিকরাও বছরের বেশিরভাগ সময় কর্মহীন থাকেন। জীবিকার তাগিদে অনেক পরিবার সন্তানদের নিয়ে শহরে পাড়ি জমান রিকশা চালানো বা গার্মেন্টসে কাজের আশায়। এতে শিশুদের পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। ফলে তাহিরপুরে শিক্ষার গড় হার মাত্র ৩১.২ শতাংশ।
উপজেলার এই বঞ্চনা দূর করতে ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট একনেক সভায় অনুমোদিত দেশের ৫০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পে তাহিরপুর উপজেলার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে আশা জেগেছিল হাওরাঞ্চলের যুবক—যুবতীরা প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে—বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গত ১৪ আগস্ট ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার পক্ষ থেকে ভূমি মালিকদের নোটিশও পাঠানো হয়। অথচ সম্প্রতি রহস্যজনকভাবে তাহিরপুরের নাম বাদ দিয়ে প্রকল্পটি জগন্নাথপুর উপজেলায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই খবর চাউর হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।
গত শনিবার তাহিরপুর উপজেলা চত্বরে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ফেরত চেয়ে মানববন্ধন কর্মসূচিও পালিত হয়েছে।
বাদাঘাটের বাসিন্দা সারোয়ার ইবনে গিয়াস বলেন, জগন্নাথপুর উপজেলা থেকে সহজেই বিভাগীয় শহরে যাতায়াত ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ সম্ভব হলেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত তাহিরপুরবাসীর পক্ষে তা কোনোভাবেই সহজ নয়। তাই এখানকার একমাত্র সম্ভাবনাময় এই উন্নয়ন উদ্যোগটি কেড়ে নেওয়া হলে জনপদের ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।
এদিকে আগামী মঙ্গলবার বেলা ১১টায় সুনামগঞ্জ শহরের আলফাত স্কয়ারে টিটিসি প্রকল্প ফেরতের দাবিতে এক প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
তাহিরপুর কারিগরি প্রশিক্ষণ বাস্তবায়ন (টিটিসি) কমিটির সদস্য সচিব মেহেদী হাসান উজ্জ্বল বলেন, শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের দিক থেকে পিছিয়ে থাকা এই উপজেলাকে আর বঞ্চিত করা যাবে না। অবিলম্বে এখানেই টিটিসি স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
প্রতিনিধি/একে