চলতি বছরের ১২ মার্চ রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে ভারতীয় মডেল ও অভিনেত্রী ত্বিষা শর্মা তার ননদকে একটি শিউরে ওঠার মতো হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পাঠান। সেখানে লিখেছিলেন, ‘তাকে (ত্বিষার স্বামী) বলুন তার স্ত্রীর অবশিষ্ট অংশ সংগ্রহ করে নিতে। তবে আগামীকাল। আমাকে এখন শান্তিতে মরতে দিন।’
সিবিআইয়ের উদ্ধৃত সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ঠিক চার মিনিট পর ৩৪ বছর বয়সী ত্বিষাকে ভোপালের নিজ বাসভবনের নিচতলা থেকে একা সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে যেতে দেখা যায়।
রাত ৯টা ৪১ মিনিটে তিনি তার বাবাকে ফোন করেন। তখন তিনি কাঁদছিলেন। ত্বিষা তার বাবাকে জানান, তার স্বামী সমর্থ সিং ‘খুবই আক্রমণাত্মক ও সহিংস’ হয়ে উঠেছে, তিনি খুব ভয় পাচ্ছেন এবং তার বাবা-মা যেন দ্রুত তার কাছে চলে আসেন। রাত প্রায় ১০টা ৫ মিনিটে তিনি আবার তার মাকে ফোন করে একই কথা বলেন, সমর্থ সহিংস রূপ নিয়েছে। এর পরপরই কলটি কেটে যায়। রাত ১০টা ২৩ মিনিটের মধ্যে সমর্থ সিং এবং তার মা গিরিবালা সিংকে সিসিটিভিতে ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়।
পরে ত্বিষাকে নিচে নামিয়ে দ্রুত ভোপালের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস নিয়ে যাওয়া হলে রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
১৪ আগস্ট সিবিআইয়ের দাখিল করা ৬০০ পৃষ্ঠার চার্জশিটে ত্বিষা শর্মা হত্যা মামলার এই ভয়াবহ মিনিট-বাই-মিনিট বিবরণ উঠে এসেছে। এতে ত্বিষার স্বামী সমর্থ সিং এবং তার শাশুড়ি গিরিবালা সিং (যিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও জেলা জজ)—উভয়ের বিরুদ্ধে ত্বিষাকে মানসিক নির্যাতন এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে এই চার্জশিট কেবল একটি রাতের ঘটনার পুনর্নির্মাণ নয়; হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, ফোন কল, পরিবারের বক্তব্য, ডাক্তার, কাউন্সেলিং সেশন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ বিশ্লেষণ করে মাত্র পাঁচ মাসের বিবাহিত জীবনে ক্রমাগত বেড়ে চলা মানসিক নির্যাতনের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে তদন্তকারী সংস্থাটি।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, মৃত্যুর ঠিক সেদিন সকালেই ত্বিষা ভোপাল ছেড়ে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য ট্রেনের টিকিট কেটেছিলেন।
সিবিআই-এর তথ্যমতে, সাবেক ‘মিস পুনে’ এবং করপোরেট খাতে যোগ দেওয়ার আগে অভিনয় পেশায় যুক্ত থাকা ত্বিষা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অনলাইন ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে সমর্থ সিংয়ের সঙ্গে পরিচিত হন। একই বছরের ৯ ডিসেম্বর তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
তদন্তে বলা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই সমর্থ ত্বিষার অতীত সম্পর্ক নিয়ে কটু কথা বলতেন এবং যৌনসূচক অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করে তার চরিত্রহনন করতেন। ত্বিষা এসব বিষয়ে অভিযোগ করলে শাশুড়ি গিরিবালা সিং সবসময় ছেলের পক্ষ নিতেন এবং তাকে উসকে দিতেন।
২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিলের দিকে তাদের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। ত্বিষার বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন ত্বিষা তার বাবার পাশে গিয়ে থাকেন। সিবিআইয়ের অভিযোগ, সেসময়ও অভিযুক্ত দুই জন তাকে ভোপালে ফিরে আসার জন্য মানসিক চাপ দিতে থাকেন। ফলে ২৪ মার্চ তিনি ভোপালে ফিরে আসেন।
১৬ এপ্রিল ত্বিষা জানতে পারেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। অনিয় পরিকল্পিত গর্ভধারণ এবং স্বামীর অনবরত দুর্ব্যবহারের কারণে তিনি সন্তান জন্ম দেওয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। ১৭ এপ্রিল এ নিয়ে ঝগড়া হলে সমর্থ আবার তার সঙ্গে গালিগালাজ করে কথা বলে। সিবিআই জানায়, সেদিনই ত্বিষা শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান।
পারিবারিক কলহের পাশাপাশি আর্থিক চাপও একটি বড় কারণ ছিল। চার্জশিট অনুযায়ী, ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের শেয়ারে ত্বিষার প্রায় ২০ লাখ রুপি বিনিয়োগ ছিল। সমর্থ ও গিরিবালা সেই টাকা ৭ এপ্রিলে খোলা একটি যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের জন্য ত্বিষাকে চাপ দিতে থাকেন।
ত্বিষা দিতে অস্বীকার করে বলেন, এই অর্থ তার বাবার। কিন্তু যে দিন তার মৃত্যু হয়, সেদিনও এই আর্থিক লেনদেন নিয়ে তার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
১২ মে রাত প্রায় ৭টা ৫১ মিনিটে ত্বিষা তার ননদ রাশি আবরোলকে ফোন করে জানান যে, তিনি বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সমর্থ তাকে শেয়ার বাজারের টাকা সরিয়ে চীনের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য চাপ দিচ্ছে।
সিবিআই যৌথভাবে যৌতুক সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে আলাদা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
চার্জশিটের পাতাজুড়ে রয়েছে ত্বিষার পাঠানো অসংখ্য বার্তা। ভোপালে ফেরার পর ৩০ এপ্রিল তিনি তার মাকে হোয়াটসঅ্যাপে লিখেছিলেন যে, তার জীবন আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছে এবং ভ্রমণের সময়ও তিনি চরম প্যানিক অ্যাটাকের (হতাশা ও ভয়) শিকার হয়েছেন।
সিবিআইয়ের তথ্যমতে তিনি লেখেন, আমার জীবন নরক হয়ে গেছে মামি (মা)।
সেদিন তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। চার্জশিটে বলা হয়েছে, ডাক্তার তাকে গর্ভাবস্থা নিয়ে অত্যন্ত মানসিক চাপে ভুগতে দেখেন। তাকে বিষণ্নতার ওষুধ দেওয়া হয় এবং শান্ত হয়ে গর্ভধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৬ মে ত্বিষা তার আগের চাকরিতে পুনরায় যোগ দেওয়ার অফার গ্রহণ করেন। একই দিনে তিনি গর্ভপাত করানোর প্রথম ওষুধ গ্রহণ করেন।
এর কয়েক ঘণ্টা পর, ৭ মে ভোরে তিনি তার মাকে বার্তা পাঠিয়ে তাকে এসে নিয়ে যাওয়ার আকুতি জানান। একটি বার্তায় লেখা ছিল, মা আপনি আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান কাল প্লিজ। তিনি তার মাকে আরও বলেন, সমর্থ তাকে আর চায় না এবং সে তাকে কেবল ‘সহ্য’ করছে।
চার্জশিট অনুযায়ী, প্রথম ওষুধ খাওয়ার পরও গর্ভাবস্থা টিকিয়ে রাখা যায় কি না তা জানতে ত্বিষাকে জোর করেন গিরিবালা। ৭ মে ত্বিষা শাশুড়ির সঙ্গে হাসপাতালে গেলে ডাক্তার জানান, এই প্রক্রিয়া আর ফেরানো সম্ভব নয়।
এরপর তাকে ড. কাকলি রায়ের কাছে পাঠানো হয়। সিবিআই জানায়, ত্বিষা সেখানে অত্যন্ত মানসিক কষ্টে ছিলেন। ত্বিষা ডাক্তারকে জানান, তার গর্ভপাতের সিদ্ধান্তে শাশুড়ি ও স্বামী প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ।
চার্জশিটে আরেকটি বিষাদময় অভিযোগ রয়েছে। ত্বিষা তার ননদকে জানান যে গর্ভপাতের জন্য শাশুড়ি গিরিবালা তাকে তিনবার ‘খুনি’ বলে ডেকেছেন। তিনি রাশিকে বার্তায় লেখেন, ‘এই লোকটি পাগল। সে আবার আগের মতো ব্যবহার শুরু করেছে... আমি ভেঙে পড়ছি, এখানে কোনও ভবিষ্যৎ দেখছি না।’
৮ মে ত্বিষা গর্ভপাতের দ্বিতীয় ওষুধটি গ্রহণ করেন। তখন তিনি তীব্র যন্ত্রণা ও রক্তক্ষরণে ভুগছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, সমর্থ এটিকে ‘নাটক’ বলে আখ্যা দেন এবং শাশুড়ি তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন।
৯ মে নাগাদ ত্বিষার পাঠানো বার্তাগুলো আরও হতাশাজনক হয়ে ওঠে। তিনি তার মাকে জানান, সমর্থ গর্ভস্থ সন্তানটি আদৌ তার কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তিনি আরও লেখেন, তার শাশুড়ি তার কথা বিশ্বাস করেন না এবং সমর্থ তার মায়ের সামনেও মিথ্যা বলে। সিবিআইয়ের মতে তিনি লিখেছিলেন, আমার এখন দম আটকে আসছে মা এখানে।
সেদিন ননদ রাশির সঙ্গে কথোপকথনে ত্বিষা মরে যাওয়ার এবং ‘হারিয়ে যাওয়ার’ ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
সিবিআই আরও জানায়, ত্বিষার সাবেক বস অমিত দাস তদন্তকারীদের বলেছেন, ত্বিষা অভিযোগ করেছিলেন, বাড়িতে তার ওপর সারাক্ষণ নজরদারি চালানো হতো এবং ফোন কল চেক করা হতো। তাই তিনি মাঝেমধ্যে পার্কে হাঁটতে বের হয়ে তার সঙ্গে কথা বলতেন।
মৃত্যুর আগের দিনও ত্বিষা তার মাকে বার্তা পাঠান...
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তার খারাপ মেজাজের জন্য তাকেই দোষী করা হচ্ছে এবং তিনি মাদক গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, অথচ তার স্বামী যে তাকে মানসিকভাবে পরিত্যাগ করেছে- তা কেউ দেখছে না।
১২ মে সকালটি শুরু হয়েছিল সেখান থেকে পালিয়ে আসার এক চেষ্টার মাধ্যমে। সিবিআই জানায়, ত্বিষা রাজস্থানের নাসিরবাদে যাওয়ার ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য তার মায়ের কাছে ৩ হাজার টাকা চান।
তিনি জানান, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি তার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন কিন্তু সমর্থ কাপল কাউন্সেলিংয়ে যেতে রাজি না হওয়ায় তিনি ফিরে আসতে চান। তার বাবা ৩ হাজার টাকা পাঠালে ত্বিষা টিকিট বুক করেন।
ত্বিষা চলে যাচ্ছেন জানতে পেরে সমর্থ কাউন্সেলিংয়ে যেতে রাজি হয়। দুপুর ১১টা ৩০ নাগাদ দুই জন ড. কাকলি রায়ের সঙ্গে দেখা করেন।
চার্জশিটে সমর্থের বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ডাক্তারের কাছে ত্বিষার আচরণের অভিযোগ করে এবং দাবি করেন, তারা দুই জন গাঁজা সেবন করতে। ডাক্তার সমর্থকে বলেন ত্বিষা ‘ভীষণ কষ্টে রয়েছে’, তাকে ধৈর্য ধরে স্ত্রীর কথা শুনতে এবং গাঁজা সেবন বন্ধ করতে পরামর্শ দেন।
তারা দুপুর ১টায় বাড়ি ফিরে আসেন। ত্বিষা বিকাল ৩টা ১১ মিনিটে পার্লারে যান এবং ৬টা ১১ মিনিটে ফেরেন।
পার্লার থেকে ফিরে সমর্থ ও গিরিবালা বাইরে হাঁটছেন দেখে ত্বিষা তাদের সঙ্গে যোগ দিতে চান। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, দুই জনই তাকে এড়িয়ে যান। এরপর ত্বিষা তার মাকে ফোন করে বলেন, এই বৈবাহিক সম্পর্কের আর কোনও উন্নতি সম্ভব নয়।
সিবিআই জানায়, তিনি চিরতরে ভোপাল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
দেশবার্তা/এমআর