চলতি বছর বিশ্বব্যাপী কয়লার চাহিদা বাড়তে পারে ১ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে মোট চাহিদা ৮৯৪ কোটি টনে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড বলে জানায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। এর প্রভাবেই কয়লার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। গতকাল প্রকাশিত প্যারিসভিত্তিক আইইএর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। খবর রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ কমে গেছে, বেড়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম।
বাড়তি খরচের হাত থেকে বাঁচতে ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে অনেক দেশই বিকল্প জ্বালানি কয়লার দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে যেসব দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, তারা কয়লার ব্যবহার বাড়িয়েছে। এতে জ্বালানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সরবরাহের অনিশ্চয়তাও কিছুটা মোকাবেলা করা সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোয় কয়লার ব্যবহার আগের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি বেড়েছে। একই প্রবণতা দেখা গেছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরুর আগে চলতি বছর বিশ্বে কয়লার চাহিদা কিছুটা কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল আইইএ। পরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ায় সে হিসাব বদলেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি চীনেও কয়লার ব্যবহার বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দেশটি রাসায়নিক পণ্যের কাঁচামাল উৎপাদনে বেশি কয়লা ব্যবহার করছে। অন্যদিকে এশিয়ার কয়েকটি দেশেও কয়লার চাহিদা বাড়ছে। এর পেছনে জলবায়ুগত পরিস্থিতি এল নিনোর প্রভাব রয়েছে। এ বছর শক্তিশালী এল নিনোর কারণে ভারত ও ভিয়েতনামে গরম বাড়ছে। এতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহারও। ফলে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। একই সময় খরার কারণে এসব দেশে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এতে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
ভবিষ্যতের পরিস্থিতি পুরোপুরি নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক হয় তার ওপর। নৌ-পথটি স্বাভাবিক হলে এলএনজি সরবরাহ বাড়তে পারে। এতে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে ২০২৭ সালে কয়লার চাহিদা কমতে পারে। কিন্তু এ গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি যদি বন্ধ থাকে, তবে আগামী বছরও কয়লার ব্যবহার আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইইএ আরো জানিয়েছে, চাহিদা বাড়লেও চলতি বছর বৈশ্বিক কয়লা উৎপাদন কিছুটা কমতে পারে। অবশ্য উৎপাদন কমলেও তা টানা তৃতীয় বছরের মতো ৯০০ কোটি টনের ওপরে থাকবে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় কয়লা উৎপাদক দেশ চীন। মূলত দেশটিতে মে মাসে একটি ভয়াবহ খনি দুর্ঘটনার পর কড়া নিরাপত্তা পরিদর্শন শুরু হওয়ায় সেখানে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে।
চীনা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বর্ধিত চাহিদার কারণে বিশ্ব বাজারে কয়লার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরবরাহ সংকট ও ঊর্ধ্বমুখী চাহিদার সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ২০২৭ সালে চীনের উৎপাদন পুনরায় স্বাভাবিক হলে বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছে আইইএ।
দেশবার্তা/এমআর