চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের মধ্যেই অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় চীনের সামরিক ও অবকাঠামোগত তৎপরতা বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যের বরাতে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট। তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের অরুণাচল প্রদেশের উজান সুবানসিরি জেলার দুর্গম সীমান্ত এলাকা গেলিমো ও তাকসিংয়ের আশপাশে নতুন স্থাপনা, সড়ক ও হেলিপ্যাড নির্মাণের চিহ্ন স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে। এসব অবকাঠামো সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় চীনের উপস্থিতি জোরদারের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় তাগিন ও নাহ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুন থেকে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় চীনা তৎপরতা বেড়েছে। স্থানীয় ছাত্র সংগঠন অল তাগিন স্টুডেন্টস ইউনিয়ন এবং একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের অনুসন্ধানী দল সীমান্তবর্তী এলাকা পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসনের কাছে পৃথক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কয়েকটি এলাকায় ভারতীয় বাহিনীর টহল অবস্থান আগের তুলনায় পিছিয়ে গেছে এবং চীনা বাহিনী সামনের দিকে অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে নঙ্গা পাহাড়সহ স্থানীয়দের ঐতিহ্যবাহী ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে জেনেভাভিত্তিক উন্মুক্ত গোয়েন্দা সংস্থা জেনসের বিশ্লেষণের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তিব্বতের লুনজে কাউন্টির ঝারি শহরের আশপাশে সাম্প্রতিক নির্মাণকাজের চিহ্ন স্যাটেলাইট চিত্রে দৃশ্যমান। এর কিছু স্থাপনা দুই দেশের বিতর্কিত বা পরস্পরের দাবি করা সীমার কাছাকাছি এলাকায় রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এসব স্থাপনার সামরিক ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা অবশ্য নিশ্চিত করা হয়নি।
তবে চীনের সীমান্ত অগ্রযাত্রা বা অনুপ্রবেশের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। তাদের পক্ষ থেকে এসব খবরকে ভিত্তিহীন ও অসত্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভরশীল।
অন্যদিকে বেইজিংয়ের বক্তব্য, ভারত-চীন সীমান্ত পরিস্থিতি বর্তমানে সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। ফলে সীমান্তে নতুন করে চীনা অগ্রযাত্রার যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব পড়ে। এরপর কয়েক দফা সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা হয়েছে।
এদিকে শি জিনপিংয়ের বর্তমান ভারত সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় পর চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের মধ্যেই সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন অবকাঠামো নির্মাণের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন ভারত-চীন উভয় দেশের দীর্ঘমেয়াদি সীমান্ত কৌশলের অংশ হতে পারে। তবে এসব নির্মাণকে সরাসরি ভূখণ্ড দখল বা সামরিক অগ্রযাত্রার প্রমাণ হিসেবে চূড়ান্তভাবে দেখার আগে স্বাধীনভাবে স্যাটেলাইট তথ্য ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি যাচাই প্রয়োজন।
দেশবার্তা/এমআর