টানা ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন প্রধান সড়ক ও নিচু এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে সড়কজুড়ে যান চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এবং দেখা দিয়েছে দীর্ঘ যানজট। জলজট ও যানজটের জোড়া ধাক্কায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও পথচারীরা।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) ভোরের দিকে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টিতে পল্টন, মালিবাগ, মৌচাক, কাকরাইল, নিউমার্কেট, মতিঝিল, মুগদা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, গোড়ান, মানিকনগর, তালতলা, আরামবাগ ও গুলিস্তানের বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও হাঁটুপানি জমে রিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চাকা ডুবে যেতে দেখা গেছে।
এতে গণপরিবহন কমে যাওয়ায় বাড়তি ভাড়া হাঁকছেন রিকশা ও ভ্যানচালকেরা। অনেক এলাকায় পানিতে নেমে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ায় চালকদের তা ঠেলে নিয়ে যেতে হয়। একই সঙ্গে দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কায় মালামাল উঁচু স্থানে সরিয়ে নেন ব্যবসায়ীরা।
ভোগান্তির কথা জানিয়ে রামপুরার বাসিন্দা মহিমা আক্তার বলেন, ‘বৃষ্টির পর রাস্তায় পানি জমে যাওয়ায় সকাল থেকেই চলাচলে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। যানবাহনও স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। ফলে অল্প দূরত্বের পথ পাড়ি দিতেও অনেক বেশি সময় লাগছে। হেঁটে যে যাব, রাস্তায় অনেক পানি থাকায় সেই অবস্থাও নেই।’
মৌচাক এলাকার পথচারী লিটন মাহমুদ বলেন, ‘রাস্তায় পানি জমে থাকায় হেঁটে চলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। যানজটের কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’
একই ধরণের অভিজ্ঞতা জানিয়ে মতিঝিলের পথচারী সাজেদুর রহমান বলেন, ‘ভোরে বৃষ্টি হলেও এখনো মতিঝিল এলাকায় জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে। কোথাও হাঁটুপানিও আছে। অফিসপাড়াখ্যাত মতিঝিলে মানুষ চলাফেরা করতে পারছে না।’
অন্যদিতে সিএনজিচালক এরশাদ আলী বলেন, ‘সকাল থেকে ঢাকার প্রায় এলাকায় দেখলাম জলাবদ্ধতা হয়ে আছে। এখন মতিঝিলে এসেও দেখলাম ডুবে আছে পুরো এলাকা। বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতার কারণে সিএনজির ইঞ্জিন বিকল হয়ে ঠেলে নিয়ে যেতে দেখেছি।’
এদিকে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সকাল থেকেই বৃষ্টি ও পানির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সবুজবাগ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মামুনুর রশীদ বলেন, ‘বৃষ্টিপাতের পর সকাল থেকেই মালিবাগ, মৌচাক ও কাকরাইল এলাকা হয়ে খিলগাঁও এলাকার রাস্তায় সম্পূর্ণ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সকাল থেকে রাস্তায় নেমে কষ্ট করে যাচ্ছি, কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারছি না। যান চলাচল সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে রয়েছে। এসব রাস্তার এক লেন দিয়েও যান চলাচল করানো যাচ্ছে না।’
সিটি করপোরেশনের সমন্বয়হীনতার অভিযোগ তুলে তিনি আরও বলেন, ‘সিটি করপোরেশনকে বারবার অনুরোধ করেছি তারা যেন এসে অন্তত ম্যানহোলের ঢাকনাগুলো খুলে দেয় বা পরিষ্কার করে দেয়, যাতে করে পানি নিষ্কাশন হতে পারে। কিন্তু তারা কোনো কিছুই করছে না। এখন রাস্তা থেকে যদি পানি না সরে, যান চলাচল ব্যবস্থার উন্নতি আমরা কীভাবে করব? সকাল থেকে কষ্ট করছি, কিন্তু আসলে কোনো সুবিধা দিতে পারছি না।’
তবে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের কর্মীরা মাঠে কাজ করছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মুখপাত্র রাসেল রহমান বলেন, ‘রোববার ভোর ৪টা থেকে মুষলধারে বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের ফলে ডিএসসিসির আওতাধীন কিছু নিম্নাঞ্চল ও ঢালু সড়কে সাময়িক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নগরবাসীর এ সাময়িক ভোগান্তি দ্রুত নিরসনে ভোর থেকেই ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।’
রাসেল রহমান আরও জানান, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম ড্রেনেজ লাইনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে পানি অপসারণে কাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে রয়েছেন ডিএসসিসির প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। সাময়িক এই ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ডিএসসিসি নগরবাসীকে ছিঁড়ে পড়া বৈদুতিক তার, বিপজ্জনক পোল ও খোলা ড্রেনের গর্ত থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ০১৭০৯-৯০০৮৮৮ নম্বরে যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। রোববার সকাল ৬টায় ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৭ শতাংশ। এর আগে শনিবার রাজধানীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
পরবর্তী পূর্বাভাষায় জানানো হয়েছে, ঢাকার আকাশ মেঘলা থাকতে পারে এবং হালকা থেকে মাঝারি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের দু-এক জায়গায় মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশবার্তা/একে