টানা আর্থিক লোকসান ও ব্যবসায়িক মন্দার মুখে অবশেষে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল রংপুরের ঐতিহ্যবাহী ও একমাত্র সচল প্রেক্ষাগৃহ ‘শাপলা টকিজ’। ফলে বিভাগীয় শহর রংপুর আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি সিনেমা হলশূন্য হয়ে পড়ল।
রোববার (২ আগস্ট) সকালে সিনেমা হলটি বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শাপলা টকিজের ব্যবস্থাপক শাহাবুদ্দিন। এর আগে গত শুক্রবার থেকে প্রেক্ষাগৃহটির প্রদর্শনী কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত করে প্রবেশদ্বারে তালা ঝুলিয়ে দেয় মালিকপক্ষ।
হল ব্যবস্থাপক শাহাবুদ্দিন জানান, দীর্ঘদিন ধরে সিনেমা চালিয়ে যে আয় হচ্ছিল, তা দিয়ে ভবন ভাড়া, বিদ্যুতের বিশাল বিল ও কর্মচারীদের ন্যূনতম বেতন মেটানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সিনেমা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে মালিকপক্ষ এতদিন নিজেদের পকেট থেকে ভর্তুকি দিয়ে হলটি সচল রেখেছিলেন। তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্রের সংকট ও সাম্প্রতিক নানামুখী প্রতিকূলতায় শেষ পর্যন্ত লড়াই থামিয়ে হল বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
মালিকপক্ষের প্রতিনিধি সাইদুর রহমান সুমন জানান, ব্যবসায়িক লোকসানের পাশাপাশি প্রেক্ষাগৃহটিতে বিভিন্ন সময় অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠছিল, যা পরিবার নিয়ে আসা রুচিশীল দর্শকদের জন্য চরম বিব্রতকর পরিবেশ তৈরি করে। এ নিয়ে রংপুর চেম্বারের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একাধিক আলোচনার পরেই হলটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
তবে এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্র প্রযোজক কামাল হোসেনের কোনো বক্তব্য জানা যায়নি।
১৯৭৮ সালের ১৬ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহে আলমের হাত ধরে রংপুর শহরের তেঁতুলতলা (বর্তমান শাপলা চত্বর) এলাকায় এই সিনেমা হলের যাত্রা শুরু হয়। ‘বসুন্ধরা’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে যাত্রা করা হলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নজরুল ইসলাম মাসুম। তার প্রয়াণের পর ভাই মিন্টু মিয়া এর পরিচালন ভার নেন। পরবর্তীতে ক্রমাগত লোকসানের কারণে সিনেমা প্রযোজক কামাল হোসেনের কাছে এটি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল।
একসময়ের উত্তরবঙ্গের অন্যতম আধুনিক ও জনপ্রিয় এই বিনোদন কেন্দ্রে শুধু রংপুর শহর নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও সিনেমা দেখতে ভিড় জমাতেন দর্শক। কিন্তু কালের আবর্তে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক খরা, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দ্রুত প্রসার এবং ভালো ছবির অভাবে হলটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। গত সপ্তাহে ‘বলবো কথা বাসর ঘরে’ ছবিটি প্রদর্শনের মাধ্যমেই দীর্ঘ ৪৮ বছরের রঙিন পথচলার করুণ সমাপ্তি ঘটল।
সংস্কৃতিমনস্ক রংপুর শহরে একসময় ‘মডার্ন হল’, ‘দরদী হল’, ‘ওরিয়েন্টাল’, ‘লক্ষ্মী টকিজ’, ‘নূর মহল (আকাশ সিনেমা হল)’, ‘চায়না টকিজ’ ও ‘সেনা হল’সহ মোট ১০টি সিনেমা হল ছিল। একে একে সবগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এতদিন শাপলা টকিজই ছিল রূপালী পর্দার শেষ প্রদীপ। এবার সেটিও নিভে যাওয়ায় পুরো বিভাগীয় শহরের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মাঝে নেমে এসেছে গভীর হতাশা।
দেশবার্তা/একে